রহিম আব্দুর রহিম।।

দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মানবাধিকার কর্মীদের অন্তহীন কর্মকান্ড অব্যাহত রয়েছে। সকল প্রকার অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যা, গুম, খুন- খারাবির বিরুদ্ধে এরা সোচ্চার। সকল প্রকার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ, সোচ্চার, ভূমিকা সত্যি প্রশংসনীয়। এরপরও থেমে নেয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত কর্মকান্ড। ঘরে- বাইরে, অফিস- আদালতে, রাজপথে, চলাফেরায় অহরহ মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দৃশ্যমান পরিস্থিতি বিস্তর  না হলেও অদৃশ্যমান পরিস্থিতি ভয়াবহ। মানবের কল্যাণে, মানবতার স্বার্থে সারা পৃথিবীর ন্যায় বাংলাদেশেও অসংখ্য এনজিও, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করছে। দাতা গোষ্ঠীর অর্থে পরিচালিত এ সমস্ত সংগঠনের সঠিক তথ্য আমার কাছে নেই। হাতে গোনা কয়েকজন মানবাধিকার কর্মীর নাম জানি মাত্র। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানকে দেখেছি বিভিন্ন চ্যানেলে। শুনেছি তার বক্তব্য, বিবৃতি। তিনি মানবাধিকার বাস্তবায়নে কাজ করেন। অর্থাৎ মানুষের জন্য তিনি নিবেদিত। সমাজ রাষ্ট্রে হাজারো মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত কাজ হচ্ছে যা আমাদের নখ দর্পণে নেই। সম্প্রতি ৬৪ বছরের অবরুদ্ধ ছিট মহলবাসীরা স্বাধীন কোন দেশের নাগরিক না হওয়ায়, তারা আন্দোলনে নেমেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারত  সরকার তাদের দাবী- দাওয়া পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। যার কোন দালিলিক ভিত্তি জন সম্মুখে নেই। বলতে গেলে, শিশুর চাঁদ পাওয়ার বায়না পূরণে, মায়ের আশ্বাসের মতই। ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহলে বর্তমানে ৫১ হাজার জন বসতি রয়েছে। যারা খেয়ে পড়ে বেঁচে আছে ঠিকই, নেই তাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়।  যারা সকল প্রকার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এরা শিক্ষা, চিকিৎসা, ক্রীড়া- বিনোদন, খাদ্য- বাসস্থানের রাষ্ট্রীয় মৌলিক অধিকার থেকে অনেক দূরে । অর্থাৎ বস্তিবাসী বা বেদের বহরের যাযাবর জীবন যাপনের চেয়েও যাদের জীবন ব্যবস্থা অধিকতর নির্মম। এই অধিকার বঞ্চিত যাযাবর জীবন ব্যবস্থার ৫১ হাজার জন মানুষের জন্য এই মুহুর্তে বাংলাদেশ- ভারতের প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিকরা যে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে তাদের চেয়ে বড় মানবাধিকারকর্মী পৃথিবীর কোন দেশে আছে বলে আমার মনে হচ্ছে না। বাস্তবতা এটাই প্রমাণ করছে। আমি একজন নগন্য নাট্যকার এবং সাংবাদিক হিসাবে তাদের জীবন- জীবিকা, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ২৫ মিনিটের একটি মঞ্চ নাটক পঞ্চগড়, দিনাজপুর, রংপুর সর্বোপরি জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ করেছি। বিভিন্ন পত্র- পত্রিকায় ছিটমহলবাসীর ৬৪ বছরের নির্মম জীবন যাপনের নির্মম চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এছাড়া দেশের খ্যাতনামা  কলামিস্ট, সাংবাদিকরা  ছিটমহল নিয়ে বিস্তর লেখা-লেখি করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। একজন সত্যিকার সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীর পূর্ণাঙ্গ বিজয় তখন, যখন তাঁর লেখনি সমাজ এবং রাষ্ট্রের নূন্যতম মঙ্গল বয়ে আনে। অথচ ৫১ হাজার অবরুদ্ধ জন মানুষের জীবন যাত্রার পরিবর্তনে কোন ইতিবাচক ফলাফল এখনও নাগালে আসেনি। সঙ্গত কারনেই একদল যুবক এবং শিশুদের অনুরোধে এই বিষয়টি আমি যেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যানকে জানাই। আমার জানানো আবেদনটি যাতে  জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেযারম্যান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার কর্মীদের কাছে উত্থাপন করে দীর্ঘ দিনের সমস্যাটি নিরসনে জনমত সৃষ্টি করেন। তাদের যৌক্তিক আবেদন নিয়ে গত ৮ অক্টোবর  মুঠোফোনে ড. মিজানুর রহমানের সাথে কথা বলি, তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য। তিনি আমাকে ৯ অক্টোবর সকাল ১০টার পর দেখা করার জন্য অনুমতি দেন। সুদূর পঞ্চগড় থেকে ঢাকায় গিয়ে  বড় মগবাজারে   অবস্থিত গ্রীণ টাওয়ার হোটেলে অবস্থান করি। পরদিন তার অফিসে গিয়ে যে চিত্র পাই, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। যা বাস্তবতার সাথে কোন মিল নেই। অফিসের টেবিলে টেবিলে দায়িত্বশীলরা দাতা গোষ্ঠী দেওয়া অর্থের নয়-ছয় হিসাব মিলাতে ব্যস্ত। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা প্রাপ্ত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান এর সাথে  সাক্ষাত করা আকাশ- কুসুম কল্পনা। তার পিএস কে অনেক আকুতি- মিনতি করার পরও প্রায় আড়াই ঘন্টা বসে থেকে চলে আসতে বাধ্য হলাম। যে ব্যক্তিটি তার  তেজদীপ্ত  বজ্রকণ্ঠে; সরকার, বিরোধীদল এবং বাঘা বাঘা মানুষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন,   মানবাধিকার বাস্তবায়নে যিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে কোন এক মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবী করেন সেই মহান মানুষটির কাছে ৬৪ বছর ধরে অবরুদ্ধ  ৫১ হাজার মানুষের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য কি করা যায় এমন পরামর্শ এবং প্রস্তাবনার বিষয়টি উত্থাপন করার সুযোগ মিলেনা। কি আজব মানবাধিকার কমিশন! অদ্ভুত কমিশন চেয়ারম্যানের রাজকীয় কার্যালয়। দাতাগোষ্ঠীর অর্থে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শুধু মাত্র বক্তব্য, বিবৃতি, সভা- সেমিনার বা বিভিন্ন মিডিয়ায় মুখরোচক কথা বলে মানবাধিকার বাস্তবায়নে রম্য কাহিনী এখন সবার জানা। আমার বাবা বেঁচে থাকতে মাঝে মাঝে বলতেন, ‘টাকা পেলে শালায় ও (শ্যালক) বাপ ডাকে।’ মানবাধিকার কমিশন যে, দাতা গোষ্ঠীর অর্থ পেয়ে শুধু মাত্র চটুল বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছে এটাই সত্য, বাস্তবতা ভিন্ন। মানবাধিকার কমিশন থেকে ফেরার পথে আমার অভিজ্ঞতার কথা গুলো যখন বলাবলি করছিলাম, ঠিক ওই সময় ওই অফিসের লিফটের অন্যান্যরা আমার কথায় সায় দিয়ে দুঃখ করে বলেছেন, ‘গাদ্দারাই বড় বড় কথা বলে, যে পুলিশ প্রশাসন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কার্যালয় পাহারা দিচ্ছে, রাষ্ট্রের অর্থে জনগনের ট্যাক্সের টাকায় যে  পুলিশ সদস্য  চেয়ারম্যানের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আছে,  তাদের যদি ব্যস্ত শহর ঢাকার যানজট নিরসনে নিয়োগ করা হতো। তাতে আর না হোক,  পথচলা নাগরিকদের একটু হলেও এদেশের নাগরিকরা নাগরিক সুবিধা পেত। তাদের মতে তথাকথিত মানবাধিকার কমিশন যা করছে তা দাতা গোষ্ঠীর অর্থ হালাল করার জন্যই। সত্যিকার মানবাধিকার বাস্তবায়ন এদের দ্বারা সম্ভব নয়। রেডিও টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন, ক্যানভাসার দের ওষুধ বিক্রি আর মানবাধিকার কমিশনের কর্মকান্ডে কোন পার্থক্য নেই। এরপরও বলছি না যে, এই কমিশন মানবাধিকার রক্ষায় কোন কাজ করছে না, করেনি। কথায় বলে, ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা অনেক ভালো।’ বর্তমান সময়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আর এ যুগের কানা মামা একই কথা ।

লেখকঃ শিক্ষক, সাংবাদিক, শিশু-সংগঠক, নাট্যকার এবং মানবাধিকারকর্মী

০১৭১৪২৫৪০৬৬ ০১৮২২০০২২৫২, ০১৮৪৩১২১২৭৯
md.rahim31@yahoo.com

1 মন্তব্য to “মানবাধিকার কমিশন, বাস্তবতা এবং এ যুগের কানা মামা”

  1. শশাঙ্ক বরণ রায় says:

    ছিটমহলের মানুষদের মানবাধিকার রক্ষায় আপনার প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়।

    জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম এবং কমিশন চেয়ারম্যানের বক্তব্য নিয়ে অনেকেরই অসন্তোষ রয়েছে। হয়ত সেটা সঙ্গতও। আপনি সুদূর পঞ্চগড় থেকে এসে তাঁর সাথে দেখা করতে পারেননি এটা অত্যন্ত দুঃখজন। তবে, সাক্ষাত করতে না পেরেই কি আপনি কমিশনের ওপর এতটা ক্ষুব্ধ? তাই এভাবে সমালোচনা করছেন? এটা একটু দৃষ্টিকটু লাগছে।

    আপনার প্রয়াসের সফলতা কামনা করছি।

মন্তব্য করুন

Designed and Developed By Domain Technologies Ltd.