বিধান সরকার, বরিশাল থেকে ॥
বৃটিশ তাড়াতে হবে দেশ থেকে। স্কুলে পড়াকালীন সময়ে মামার কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন এই মর্মে। মাধ্যমিক পাশের পর পিতার মৃত্যুতে পড়ালেখা বন্ধ হলে পুরোটাই জড়িয়ে পড়েন স্বদেশ মুক্তির আন্দোলনে। পৈত্রিক নিবাস ঝালকাঠী জেলার কেওড়া থেকে চলে আসেন বরিশালে। আশ্রয় পান কমিউনিস্ট নেতা নিকর দাসগুপ্তের বাড়ির কমিউনে। এ কথা আজ থেকে ৬৭ বছর আগেকার মানে ১৯৪৩ সালের। বাসন্তি রায়ের ন্যায় বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা ১৫ থেকে ২০ জন মেয়ে আশ্রয় পেয়েছিলেন এই কমিউনে। এখানে তাঁত বোনা, কাঁথা সেলাই সহ বিভিন্ন ধরণের হস্ত শিল্পের কাজ করতেন। স্মৃতি ভ্রম হয় বলে সময় নিয়ে মনে করলেন গৈলার সরযূ সেন, সিতুদি, ভাটিখানার আন্দামান ফেরত নেতা হিরামন চ্যাটার্জী তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের কথা শোনাতেন। সব মিলিয়ে ৭০ জনের ওপরে মহিলা কর্মী ছিলেন তার। চাঁদা তুলতেন, দূরগ্রামে গিয়ে নারীদের উদ্বুদ্ধ করতেন। হিজলা, মুলাদী, পটুয়াখালী হয়ে ফ্রেন্ডস এসোসিয়েশনের ব্যানারে পশ্চিমবঙ্গের কেনিং এলাকায় দেড় বছর রিলিফ বিতরণ করেছেন অসহায় জনতার মাঝে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে দুর্ভিক্ষের সময় কিংবদন্তীর মানবী মনোরমা বসু মাসিমার সাথে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির ব্যানারে লঙ্গরখানা খুলেছিলেন। এমনিভাবে পথ চলতে গিয়ে ১৯৪৫ সালে বিয়ে করেন তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির অফিস সেক্রেটারী বাণী রায়কে। বিয়ে করে সংসারী হলেও বসে থাকার জো ছিলনা। সময়ের ব্যবধানে একদা নগরীর কালীশচন্দ্র রোডের বাসভবন হয়ে ওঠে অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থল, কমিউন হিসাবে। হাসপাতাল রোড থেকে কালীশচন্দ্র সড়কে প্রবেশ করে দুই কদম হাঁটলেই দেখতে পাবেন বাসন্তী রায়ের পেরো বাড়ি। চেহারায় বলে দেবে ওটা কতটা বছরের পুরানো। এখানেই সেদিন দুপুরে আলো আঁধারির মধ্যে কথা হয় বাসন্তী রায়ের সাথে। জানালেন চোখের আলো ফুরিয়ে গেছে বছর দুয়েক হলো। সাথে আছে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিক। স্মৃতিভ্রম হলেও মনোবল হারাননি আদৌ। স্বামী রাজনীতিতে সক্রিয় থাকাকালীন পার্টি কমরেডদের জন্য ভাত রাধা, থাকতে দেয়া এই নিয়ে শুরু হয়েছিল তার কমিউনের যাত্রা। ১৯৫০ সালে দাঙ্গা হলে উজিরপুরের ধামুরা গ্রামের ফুলমনি মাঝি, ফরিদপুর এলাকার পঞ্চানন, রাধা, শৈলেন্দ্র, আয়না, সোনা, দিনেশ, পুতুল, মুকুন্দ, মঙ্গল, মনি সহ আরো বেশ কয়েকজন বাসন্তী রায়ের কালীশচন্দ্র রোডের কমিউনে আশ্রয় পান। অপরদিকে হরিনাফুলিয়া গ্রামের বাড়ির কমিউনে আশ্রয় মেলে দুর্ভিক্ষপীড়িত লোকজনের। মাস পেরিয়ে বছর পেরিয়ে কেউবা কাজের তাগিদে অন্যত্র চলে গেলেও স্থায়ী আবাস গাড়েন ফুলমনির পরিবার। এছাড়াও এখানে থাকছেন আরো দুই পরিবারের সদস্যরা। আশ্রয় পেয়েছে পিতা-মাতার ফেলে যাওয়া অবুঝ সন্তান সবুজ। এখানেই বেড়ে ওঠা মহম্মদ সবুজ এখন কেমিষ্ট ল্যাবরেটরীতে চাকুরী করেছে। শিলা বিশ্বাস ও নিপা হালদার নামক দুই কমিউন সদস্য মাধ্যমিকে পড়াশুনা করছেন। আরা নীলা বিশ্বাস পড়ছে মাধ্যমিকে। স্বামী ও দুই পুত্রে মৃত্যুর পর একমাত্র কন্যা ব্যাংক কর্মকর্তা কুমারী রুমঝুম রায়ের সাথে কমিউনে থাকা ১০ জন নিয়ে মোট ১২ সদস্যের সংসার তার। ব্যাংকার কন্যার আয়, দেহাতের বাড়ির জমির ধান, রিক্সা গ্যারেজ ভাড়া আর সদস্যদের সহায়তা এই করে চলছে নগরীর কালীশচন্দ্র সড়কের ১২ সদস্যের কমিউন। অনুরূপভাবে হরিনাফুলিয়া দেহাতে প্রিয়নাথের বংশধরদের নিয়ে ৮ সদস্যের কমিউন চলছে জমিতে উৎপাদিত শস্য বিক্রির আয়ে। আলাপকালে জানা গেছে এই কমিউনে স্থায়ী সদস্য ব্যতীত অসহায় ব্যক্তিদেরও থাকার আশ্রয় মেলে। তবে তা দুইচার দিনের জন্য। কেউবা মালামাল রেখে যান আমানত হিসেবে। সে যাই হোক, এই করে বয়সতো আর কম হয়নি আটটি দশক ছুঁয়েছে; তা আপনার অবর্তমানে কমিউনের অবস্থা কি হবে? এই প্রশ্ন শুনে স্বভাবসুলভ স্মিতহাস্যে জবাব দিলেন-কি আর হবে, নিজ কন্যাকে দেখিয়ে বলেন আমার পর ও-ই দেখভাল করবে।








বিনম্র প্রণাম জানাই এই মহিয়সীকে। কেমন উজ্জ্বল আলো হয়ে জ্বলছেন এই আকালের দিনে এই আশিতেও! আমরা যদি তাঁর জ্বেলে রাখা আলো থেকে একটু একটু ধারও নিতে পারি তাহলেই আমাদের দেশটা হেসে উঠবে তাঁর মতোই পবিত্র হাসিতে।
কি অসাধারণ। শ্রদ্ধা জানাই এই মহাত্মাকে। আর ধন্যবাদ বিধান সরকারকে।