রহিম আব্দুর রহিম।।
বছর পেরিয়ে ৪০শে পা। ১৯৭১ সাল। বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতার বছর। পাকিস্তানী শাসন-শোষণের কব্জা থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে সেদিন বাঙ্গালী জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে লড়েছে। ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতা। দীর্ঘ নয়টি মাস এজন্য জাতিকে লড়তে হয়েছে এক শক্তিশালী ও বর্বর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। নয় মাসের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কয়েক লাখ মানুষ আত্মহুতি দিয়েছে। অপরিমেয় ক্ষতি হয়েছে দেশের সম্পদের। এই যুদ্ধে শুধু যে লড়াকুরা প্রাণ হারিয়েছেন তাই নয়, প্রাণ হারিয়েছেন যাঁরা এই যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন। যত্রতত্র মানুষ জীবন হারিয়েছে হানাদার বাহিনী ও তার দোসর রাজাকার আলবদর নামের ঘাতক বাহিনীর হাতে। অগণিত মানুষের জীবনের বিনিময়ে বাঙ্গালী জাতি তাদের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁদের আত্মাহুতির মাস হিসেবে পুরো ডিসেম্বর মাসকে বাঙ্গালী জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। শহীদদের মাজার, মিনার ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ লোক মারা গেছেন। এ যুদ্ধে সহিত্যিক, সাংবাদিক, ডাক্তার, পুলিশ, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ অনেকেরই প্রাণহানি ঘটেছে। তাঁদের অধিকাংশই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। তবু তাদের প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। তাদের কারো নাম ইতিহাসে গ্রন্থিত হয়েছে, আবার কারও নাম সুরের ভুবনে পল্লবিত হচ্ছে। ‘হয়তবা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবে না, বড় বড় লোকদের ভিড়ে- জ্ঞানী আর গুণীদের আসরে তোমাদের কথা কেউ কবে না- হে বিজয়ী বীর মুক্তিসেনা তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না।’ জনপ্রিয় এই দেশাত্মবোধক গানের কলিতে তাদের প্রতি শুধু কৃতজ্ঞতার বাণী প্রকাশ করা হয়েছে। এই স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করে, নব-প্রজন্ম আবারো সুরের ভুবনে বিমোহিত হচ্ছে- ‘জন্ম আমার ধন্য হলাম মাগো- কেমন করে আকুল হয়ে- আমায় তুমি ডাকো’ এই গানের ভুবনের প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় মহা মনীষীদের আত্মহুতি নির্মম কাহিনী নিয়েই আমাদের আজকের প্রতিবেদন। এক হিসেব অনুযায়ী দেখা যায়, পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর আগেই ৩৬০ জন বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের হত্যা করে পরিকল্পিতভাবে। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, লেঃ জেঃ নিয়াজী আত্মসমর্পণের আগেই অত্যন্ত পরিকল্পিত ও নৃশংসভাবে বুদ্ধিজীবী ও অন্যদের হত্যা করেছিল। অবশ্য কিছুসংখ্যক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল ২৫ মার্চে বা মার্চ-এপ্রিলে। যেসব বুদ্ধিজীবী ১৯৭১ সালে নিহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন, এ এন এম মনীরুজ্জামান, ডঃ গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, ডঃ জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, আবদুল মুকতাদির, এস এম রাশীদুল হাসান, ডঃ এন এম ফয়জুল মহী, ফজলুর রহমান খান, ডঃ সিরাজুল হক খান, ডঃ এম এ খায়ের, সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, খোন্দকার আবু তালেব, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, নিজামুদ্দিন আহমদ, শহীদ সাবের, সেলিনা পারভীন, আলতাফ মাহমুদ, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, মেহেরুন্নেসা, ডাঃ ফজলে রাব্বী, আব্দুল আলীম চৌধুরী, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা, যোগেশ চন্দ্র ঘোষ, শামস ইরানী প্রমুখ। ডঃ গোবিন্দ চন্দ্র দেব, এ এন এম মুনিরুজ্জামান ২৫ মার্চ অর্থাৎ পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর প্রথম আক্রমণেই তাঁরা নিহত হন। জ্যোতির্ময় শুহ ঠাকুরতা ২৫ মার্চ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। আলতাফ মাহমুদ মারা যান আগস্টে। যিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সহযোগি হিসাবে অনন্য অবদান রেখেছেন। তার বাড়ীতে অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া যায়, এ থেকে বোঝা যায় যে, তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বতোভাবে সহযোগিতা দান করেছেন। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকায় আরো রয়েছেন, অনীল চন্দ্র মল্লিক, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, অমল কৃষ্ণ সোম, আজাহারুল হক, আতাউর রহমান, আনোয়ারা পাশা, আনোয়ারুল আজীম, আবদুস সোবাহান-১, আবদুস সোবাহান-২, আবদুর রউফ সরদার, আবদুর রহমান, আব্দুল আহাদ, আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার, আব্দুল গনি, আব্দুল গফুর, আব্দুল জলিল, আব্দুল জব্বার, আব্দুল মমিন, আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া, আবু তালেব, আবুল বাসার, আবুল কালাম আজাদ, আ কা মোঃ শামসুদ্দিন, আবু সাঈদ, আবু হেনা শামসুদ্দোহা, আবদুস সাত্তার, আবুল খায়ের, আমির উদ্দীন, আলতাফ হোসেন ইজারাদার, আলতাফ, হোসেন, আলমগীর, আশরাফুল ইসলাম ভুঁইয়া, এ এন এম মনিরুজ্জামান, এ এফ এম জিয়াউর রহমান, এ কে এম নূরুল হক, এ কে এম বদিউজ্জামান মন্ডল, এ কে এম লুৎফর রহমান, এ কে এম সিদ্দীক, এ কে এম সামসউদ্দিন, এ টি এ জাফর আলম, এম এইচ চৌধুরী, এম এ এম ফয়জুল মহী, এম নূর হোসেন, এম হামুদুর রহমান, এস এম ইসমাইল হোসেন, এস এম ফজলুল হক, এস এম সাইফুল ইসলাম, এস এম মান্নান (লাডু ভাই), কছিম উদ্দিন আহম্মদ, কবির উদ্দিন, কাজী আবদুল মালেক, কাজী আবুল কাশেম-১, কাজী ওবায়দুল হক, কামিনী কুমার চক্রবর্তী, কালাচাঁদ রায়, খালেদ রশীদ, মোঃ ইলাহী বক্স, গিয়াস উদ্দিন আহাম্মদ, গোবিন্দ চন্দ্র বিশ্বাস, গোলাম মহিউদ্দিন আহমদ, গোলাম রহমান, গোলাম সারওয়ার, গোলাম হোসেন, চিত্ত রঞ্জন রায়, চিশতী শাহ হেলালুর রহমান, জিকারুল হক, ছমির উদ্দিন মন্ডল, জহির রায়হান, জহিরুল ইসলাম, জিতেন্দ্র লাল দত্ত, জ্যোতির্ময় শুহ ঠাকুরতা, তসলিম উদ্দিন আহমদ, তারাকান্ত ভৌমিক, দিবেশ চন্দ্র চৌধুরী, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, নাওশাদ আলী তরফদার, নিজামুদ্দিন আহমদ, নিত্যানন্দ পাল, নতুন চন্দ্র সিংহ, নূরুল আমিন খান, প্রফুল্ল চন্দ্র বিশ্বাস, ফজলুর রব, ফেরদৌস দৌলা বাবলু, বদিউজ্জামান মন্ডল, ধীরেন্দ্রনাথ সরকার, মজিবর রহমান, মকসুদ আহমদ, মনিভূষণ চক্রবর্তী, মতিউর রহমান, মনোরঞ্জন, মশিউর রহমান, মহসিন আলী দেওয়ান, মহিউদ্দীন হায়দার, মামুন মাহমুদ, মায়াময় ব্যানার্জী, মাশুকুর রহমান, মাহমুদ হোসেন আখন্দ, মিজানুর রহমান সাইফ, মীর আবদুল মুক্তাদির, মেহেরুন্নেসা, মোঃ আবদুল বারী মিয়া, মোঃ আমিন উদ্দিন, মোঃ আরজ আলী, মোঃ খবির উদ্দিন মিয়া, মোঃ তসলিম উদ্দিন, মোঃ নজরুল ইসলাম, মোঃ মনসুর আলী মল্লিক, মোঃ মোমিনুল হক, মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন, মোঃ মোসলেম উদ্দিন মিয়া, মোঃ রোস্তম আলী, মোঃ শহর আলী, মোঃ সেকান্দর আলী, মোয়াজ্জেম হোসেন, মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী, মোহাম্মদ মোর্তাজ, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, মোহাম্মদ শামসুজ্জামান, যোগেশ চন্দ্র ঘোষ, রণদা প্রসাদ সাহা, রফিকুল ইসলাম, রবি বসাক, রমনী কান্ত নন্দী, রাখাল চন্দ্র দাস, রামকৃষ্ণ অধিকারী, রাশীদুল হাসান, রেজাউন নবী, রেবতী কান্ত সান্যাল, ললিত কুমার বল, লুৎফুন্নাহার (হেলেনা), শফিকুর রহমান ভুঁইয়, শরাফত আলী, শশাঙ্ক পাল, শহীদ সায়ের, শহীদুল্লাহ কায়সার, শামসুজ্জামান, সামসুদ্দোহা, শামসুল হক, শামসুল হক খান, শাহ আবদুল মজিদ, শাহ মোহাম্মদ সোলায়মান, শিবাজী মোহন চৌধুরী, শেখ আবদুস সালাম, শেখ মাহতাব উদ্দিন, শেখ হাবিবুর রহমান, শৈলেন্দ কুমার সেন, সন্তোষ কুমার দাস, সাদত আলী, সায়ীদুল হাসান, সিরাজুদ্দিন হোসেন, সিরাজুল হক খান, সুনাহার আলী, সুনীল বরণ চক্রবর্তী, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, সুধীর কুমার ঘোষ, সুলেমান খান, সেলিনা পারভীন, সৈয়দ আবদুল হাই, সৈয়দ নজমূল হক, হাবিবুর রহমান, হরিনাথ দে, হাসিময় হাজরা, হেমচন্দ্র বসাক (বলাই), রশীদ সরকার, গোলকার হোসেন তালুকদার, আবদুর রহিম খান, আয়েশা বেদৌরা চৌধুরী, হুমায়ুন কবির, কায়সার উদ্দিন, গোলাম মুর্তজা, হাফিজ উদ্দিন খান, জাহাঙ্গীর, মিহির কুমার সেন, সালেহ আহমদ, সুনীল চন্দ্র শর্মা, মকবুল আহমদ, এনামূল হক ও লেঃ কঃ জাহাঙ্গীর। ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বর ঢাকায় যারা শহীদ হন তাঁরা হলেন, সিরাজুদ্দিন হোসেন ১০ ডিসেম্বর, এম এ মান্নান এ আকতার ১০ ডিসেম্বর, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, ১১ ডিসেম্বর সৈয়দ নজমূল হক ১১ ডিসেম্বর। ১৪ ডিসেম্বর যে সব বুদ্ধিজীবী গ্রেফতার হন তাঁরা হলেন- ডাঃ আমিনুদ্দিন আহমদ, ডাঃ আজহারুল হক, ডঃ হুমায়ুন কবীর, ডাঃ ফজলে রাব্বী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, আনোয়ার পাশা, রশিদুল হাসান, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ। ১৫ ডিসেম্বর যে সব বুদ্ধিজীবী গ্রেফতার হন তারা হলেন, শামসুর রহমান ওরফে শামস ইরানী, ডঃ আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ। বিশাল তালিকায় বুদ্ধিজীবীদের নাম রয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের হত্যা কাহিনী উদঘাটন করা সম্ভব হয় নি। উল্লেখযোগ্য কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর নির্মম হত্যা কাহিনী বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে যা নিচে বর্ণনা করা হলো। ২৫ মার্চের গভীর রাতে ডঃ জিসি দেব ঘুমিয়েছেন। গভীর রাত। হঠাৎ দরজায় বুটের লাথি। দরজা খুলে দিলেন জিসি দেব। দরজা খোলামাত্র খুনীরা প্রবেশ করলো কক্ষে, ইতর ভাষায় অশ্রাব্য গালি দিল ডঃ জিসি দেবকে। শয়তানরা তাঁর গালে প্রচন্ড এক চপেটাঘাত করে। তাঁর অপরাধ তিনি দরজা খুলতে দেরী করেছেন। এরপর প্রশ্ন করে অস্ত্রশস্ত্র গোলা-বারুদ কোথায় আছে? বুকে ঠেকিয়ে রেখেছে বেয়নেট। গুলির শব্দে বাড়ী প্রকম্পিত। উন্মত্ত পশুদের উল্লাসে বাড়িতে আতংক। মুহুর্তে খুঁচিয়ে শেষ করে দেয়া হয় ডঃ জিসি দেবকে। প্রাণহীন দেহ রক্ত স্রোতের মধ্যে পড়ে থাকে। শয়তানরা উল্লাস করে চলে যায়। অভিনেতা, গায়ক, সুরকার আলতাফ মাহমুদকে গ্রেফতার করা হয় ৩০ আগস্ট। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি’ এই বিখ্যাত গানের সুরকার আলতাফ মাহমুদ। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে। আচমকা দরজায় করাঘাত। আতংকে কম্পিত মন অজানা আশংকায় কেঁপে ওঠে। দরজা খুলতেই চোখে পড়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর একটি জীপ দাঁড়িয়ে। হানাদার বাহিনীর সেনারা ঘিরে ফেলেছে তার আউটার সার্কুলার রোডের বাড়ি। এ সময় পাকিস্তানী সৈনিকদের সাথে দুইজন বাঙ্গালী যুবক ছিল, যারা আলতাফ মাহমুদকে চিনিয়ে দেয়। আলতাফ মাহমুদকে ওই দুই যুবক চিনিয়ে দেওয়া মাত্র, পাঞ্জাবী খান সেনারা মাহমুদের দুইহাত কষে ধরে ফেলে। তাঁর উপর চলে উপর্যুপরি অবর্ণনীয় অত্যাচার। নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে অজানার উদ্দেশ্যে। ধারণা করা হয়, ৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর লাশের কোন হাদিস পাওয়া যায়নি। ১৯৬/৩-এর শান্তিবাগ বাসা থেকে ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। এ বাসাটি তাঁর নিজস্ব নয়। তিনি থাকতেন ছোট ভাইদের বাসায়। নিখোঁজ হবার দিন, দুপুর বারোটার দিকে তিনি গোসলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পরণে ছিলো ড্রেসিং গাউন, হাতে লুঙ্গি, গেঞ্জি, তোয়ালে। টেবিলে তাঁর জন্য খাবার প্রস্তুত। গোসল সেরেই তিনি খেতে বসবেন। ঠিক ওই মুহুর্তে ছাই রঙ্গের প্যান্ট পরিহিত, মুখে বিভিন্ন রঙ্গের রুমাল বাঁধা, হাতে অস্ত্র নিয়ে ৮/৯ জন যুবক, কাঁদা মাখানো একটি বাস নিয়ে হাজির হয় তাঁর বাসায়। যুবকরা জোর করে প্রবেশ করে ওই বাড়িতে। বিকেলের মধ্যে তাঁকে ফিরিয়ে দেবে বলে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। এখন আছেন শহীদদের তালিকায়। তরুণ সাংবাদিক আ ন ম গোলাম মোস্তফাকে হত্যা করা হয় ১ ডিসেম্বর। তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, তাঁর বাসা থেকে। মোস্তফা তাঁর স্ত্রী ঋর্ণা মোস্তফার কোল থেকে সবেমাত্র ৯ মাসের শিশু সন্তান অভিকে কোলে নিয়ে পায়চারী করছিলেন। এরই মাঝে তাঁর বাসায় উপস্থিত হয় হানাদার বাহিনীর তিন জল্লাদ। তারা মোস্তফাকে বাইরে ডেকে এনে তাদের সাথে যেতে বলে। বাচ্চাকে নামিয়ে রেখে তাদের সাথে তিনি বেরিয়ে যান। এরপর আর তিনি ফিরে আসেননি। সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমদকে ধরে নিয়ে যায় আলবদররা। তিনি ছিলেন বিবিসি ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর সংবাদদাতা। ১১ ডিসেম্বর তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর অপরাধ ছিলো, বিবিসি’র এক রিপোর্ট বলা হয়েছিল, জেনারেল নিয়াজী পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গেছেন। এই সংবাদে নিয়াজী ব্যক্তিগতভাবে বিবিসি’র প্রতিনিধির উপর ক্ষিপ্ত হন। তিনি নিজেই হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এসে নিজাম উদ্দীনকে খোঁজ করে। তাঁকে না পেয়ে তিনি চলে যান। পরে আলবদররা তাঁকে ধরে নিয়ে জেনারেল নিয়াজির নির্দেশই হত্যা করে। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ১৪ ডিসেম্বর, স্নান সেরে মার কাছে খাবার চেয়েছিলেন মাত্র। সে সময় ঢাকার সেন্ট্রাল রোডে অধ্যাপকের পৈতৃক বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে আলবদর সদস্যরা। অধ্যাপক চৌধুরীকে জানায়, কমান্ডার আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য ডাকছেন। এক্ষুণি ফিরে আসবেন। এই বলে তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। লুঙ্গি পরা, গেঞ্জি গায়, এলোমেলো চুল নিয়েই তিনি বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন। পশুরা তাকে হত্যা করে। তিনি আর ফিরে আসেননি। আনোয়ারা পাশা থাকতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টারের ৩০ নং বিল্ডিং-এ। ১৪ ডিসেম্বর তাঁর বাসায় আসেন আলবদরের সদস্যরা। তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যাম্পে। সেখানে তাঁকে হত্যা করা হয়। শামসুর রহমান ওরফে শামস ইরানী ১৫ ডিসেম্বর বিকেল ৫ টায় গ্রেফতার হন। কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর লোকেরা তার রায় সাহেব বাজারস্থ বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে। ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। রাতেই তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর লাশ পাওয়া যায় রায়ের বাজার ইটাখোলাস্থ বধ্যভূমিতে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার কিভাবে বাসা থেকে গ্রেফতার হন সে বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী পান্না কায়ছার। ‘মুক্তিযুদ্ধ আগে ও পরে’ গ্রন্থে। ১২ ডিসেম্বর চারটা পর্যন্ত কারফিউ ছিল না।…. ওকে জিজ্ঞেস করলাম- তোমরা কি নিয়ে তর্ক করছ? বলেছিল আমাকে বাসা থেকে চলে যেতে। সোভিয়েত সংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রধান নবীকভ ওর খুব বন্ধু ছিলেন। উনি খবর পাঠিয়েছেন সোভিয়েত দূতাবাসে আশ্রয় নিতে। চারিদিকে গুপ্ত হত্যা চলছে। কথাটা শুনেই আমার মনে পড়ল ১০ তারিখে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার হত্যাকান্ডের কথা। এরপর আমিও ভয় পেয়ে গেলাম। বললাম, তুমি আর দেরি করো না, আজই চলে যাও।’ তারপর পান্না কায়সার চাচা শ্বশুরকে অনুরোধ করেন তিনি যেন শহীদুল্লাহ কায়সারকে অন্যত্র সরে যেতে বলেন। চাচাও কায়সারকে বোঝান। ‘ঠিক হলো পরদিন (১৩ ডিসেম্বর) শহীদুল্লাহ বাসা থেকে সরে যাবে। একাই যাবে।’ শহীদুল্লাহ বের হয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসেন। তিনি আর যাননি। ১৪ ডিসেম্বর ‘রাজাকাররা ভেতরে ঢুকেই সবাইকে আটকে ফেলেছে। যার জন্য ওদের উপরে আসতে দেরী হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর ৩-৪ জন লোক টপটপ করে উপরে ওঠে এল। ওদের সবাইর মুখ কালো কাপড়ে বাঁধা। ব্লাক আউটের কারণে ঘরে মোমবাতি জ্বলছিল। রাজাকাররা শহীদুল্লাহর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনার নাম কি? শহীদুল্লাহ ওর নাম বলার সাথে সাথে কুকুরগুলো ওর হাতটা ধরে টান দিয়ে বলল, চলুন আমাদের সঙ্গে। আমার চিৎকার শুনে পাশের ঘর থেকে ননদ সাহানা দৌড়ে বারান্দার বাতিটা জ্বালিয়ে দিল। ইতোমধ্যে ওকে ওরা টানতে টানতে সিঁড়ি পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। আমিও এক হাত ধরে ওকে টেনে ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করছি। ঘাতকরা বেয়নেটের নল দিয়ে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। আমি ছিটকে পড়ে গেলাম। একপর্যায়ে বেবী ওর এক হাত দিয়ে ওদের একজনের মুখের কালো কাপড়টা টান দিয়ে খুলে ফেলল আর অমনি আলোতে লোকটার চেহারা দেখে ফেললাম। ওরা টানতে টানতে ওকে সিঁড়ি দিয়ে নিয়ে যাবার সময় শহীদুল্লাহ আরো জোরে বোনের হাতটা ধরে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেননি। এভাবেই বাসা থেকে তিনি ধরা পড়েন। রাজাকাররা যখন গেটে ধাক্কাধাক্কি করছিল তখন শহীদুল্লাহ কায়সার ভেবেছিলেন মুক্তিবাহিনীর লোকেরা বুঝি তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।’সাংবাদিক সৈয়দ নজমূল হক ছিলেন পিপিআইএর ঢাকা অফিসের চীফ রিপোর্টার। তাঁকে ঘাতকরা ধরে নিয়ে যায় ১১ ডিসেম্বর ভোর ৪টায়। হঠাৎ নজমূল হক বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার শুরু করেন। কারণ তার বাসার ছাদ হঠাৎ ভেঙ্গে পড়ছে। এর মাঝে ঘাতকরা এসে তাঁকে হত্যা করে। বিজ্ঞান গবেষণাগারে সিনিয়র রিসার্চ কর্মকর্তা ডঃ আমিনুদ্দিন আহমদকে আলবদররা তাঁর বাসভবন থেকে ১৪ ডিসেম্বর ধরে নিয়ে হত্যা করে। তাঁর লাশ পাওয়া যায়নি। ১৫ ডিসেম্বর ডঃ আজাহারুল হক ও ডঃ হুমায়ুন কবির তাঁদের কর্মস্থল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে বদর বাহিনী তাঁদের ধরে নিয়ে যায়। নটরডেম কলেজ সংলগ্ন পোলের কাছে তাদের লাশ পাওয়া যায়। ১০ ডিসেম্বর রাতে আলবদর বাহিনীর লোকেরা এম এ মান্নান ও এম এ আকতারের পুরানো পল্টনস্থ বাসভবনে হামলা করে। তাঁদের দুইজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের দুইজনের বিকৃত লাশ পাওয়া যায় রায়ের বাজারে। চিকিৎসক ডাঃ ফজলে রাব্বিকে ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে রাজাকার আলবদর ও আর্মির লোকেরা তাঁর বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। এ সম্পর্কে তাঁর স্ত্রী ডাঃ জাহানারা রাব্বি লিখেছেন- ‘এসে দেখলাম তিনি ওদের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করেছেন। চারদিক থেকে ৫-৭ জন সশস্ত্র সৈন্য তাঁকে ঘিরে আছে। আমি দৌড়ে গিয়ে বাধা দিতে চেষ্টা করলাম। ‘হল্ট’ বলে দুইজন এগিয়ে এসে আমার বুকে বন্দুকের নল চেপে ধরল। আমি স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে গেলাম। আমি দেখলাম পেছন থেকে তিনি মাথা উঁচু করে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠলেন। গাড়িটা আস্তে আস্তে চলতে শুরু করলো। ওরা আমার বুক থেকে বন্দুক নামালো। তখন বেলা ৪টা ১৫ মিনিট। ১৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাত তিনটায় লালমাটিয়া ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউট থেকে ট্রাক তুলে তাঁদের রায়ের বাজারের ইটখোলায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই খুন করা হয়।’ ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দিন হোসেনকে হত্যা করা হয় ১১ ডিসেম্বর। ১০ ডিসেম্বর রাত তখন প্রায় দশটা। চামেলীবাগের বাসায় টেলিভিশন দেখছিলেন। ভাল লাগছে না। তাই হারিকেনের অস্পষ্ট আলোতে লুডু খেলতে বসেছেন ছেলেদের সাথে। এক মনে খেলছেন। স্ত্রী নূরজাহান বেগমের শরীর অসুস্থ। ছোট ছোট বাচ্চা তিনটিও ঘুমিও পড়ল। ঠিক সেই মুহুর্তে বাইরে থেকে কে যেন দরজায় মৃদু আঘাত করল। ঘরের প্রতিটি প্রাণী সচকিত হল আঘাতের শব্দে। ওরা কেউ সাহস করে খুলে দিল না দরজা। দেখতে চেষ্টা করল না যে, এত রাতে এভাবে কে এল। পাঁচ মিনিট পর আবার। কিন্তু হতবিহ্বল ওরা শুধু অসহায়ভাবে বসে থাকলেন। সিরাজুদ্দিন সাহেব শেষবারের আঘাতের সাথে উঠে দাঁড়ালেন। পিতার সাথেই উঠে দাঁড়িয়েছেন দ্বিতীয় পুত্র শাহিন। এগিয়ে গেল সে দরজার কাছে। কিন্তু কাছে কোথাও গুলী ছোড়ার শব্দে দরজা না খুলেই দাঁড়িয়ে থাকলেন তিনি। কেটে গেল আর পাঁচ মিনিট। দরজা খুলে দিলেন। বারান্দাটা তখন ফাঁকা। হয়তো নিঃশব্দে আঁধারে গা ডুবিয়ে তাঁকে সাবধান করতে আরো কেউ এসেছিল। ব্যর্থ হয়েই ফিরে গেছে তারা। দরজাতে শেষবার আঘাত পড়েছিল রাত সাড়ে তিনটার কাছাকাছি। ভারী বুটের লাথি। ভেতরে ঢুকে আলবদররা দেরি করল না। অবকাশ দিল না কাউকে কিছু বলার। একটা গামছা এনে শক্ত করে বেঁধে ফেললো সিরাজ সাহেবের চোখ দুটি। তারপর শুধু লুঙ্গি পরনে আর গেঞ্জি গায়ে প্রচন্ড শীতের মাঝে থরথর কম্পমান তাঁর শীর্ণ দেহটি মিলিয়ে গেল ওদের সাথে ব্লাক আউটের কালো আঁধারের মাঝে। প্রতি বছর ডিসেম্বর এলেই বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস পালন এবং বিজয়ের সুরে আমরা বিমোহিত থাকি। সময়ের ব্যবধানে শুধু মনে পরে এই শহীদ মনিষীদের কথা। আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি ১৯৭১ সালের ঘাতকরা কেউ গ্রেফতার হয়েছে, কাউকে গ্রেফতার করার প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমান সরকারের স্ব-ইচ্ছায় এই অপরাধীদের বিচার দ্রুত হবে বলে সবার বিশ্বাস। সম্প্রতি প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বিদেশ সফর কালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিষ্পন্ন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এই আহবান বর্তমান সরকারের বিচার প্রক্রিয়াকে যথেষ্ট সমর্থন হিসাবে পরিগণিত হওয়ারই কথা। এর আগের প্রতিটি দিবসে শুধু বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিচারণ এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দিবসের সমাপ্তি করা হয়েছে। চলতি ডিসেম্বর, বিজয়ের ৪০ বছর পূর্তি, আমরা কলঙ্কের দ্রষ্টা পাপীদের শেষদৃশ্য দেখার অপেক্ষায় রইলাম।







