বিধান সরকার ॥
“দেশের অন্যসব শিক্ষার্থীদের মতো দারিদ্র নিবন্ধন কোন স্কুল-কলেজে গিয়ে পয়সা দিয়ে বিদ্যা কিনতে পারিনি আমি। তাই কোন স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসা আমার শিক্ষা পীঠ নয়। আমার শিক্ষা পীঠ হলো লাইব্রেরী। আশৈশব আমি লাইব্রেরিকে ভালোবেসে এসেছি এবং এখনো ভালোবাসি। লাইব্রেরী হলো তীর্থস্থান। আমার মতে মন্দির, মসজিদ, গীর্জা থেকে লাইব্রেরী বহুগুণ শ্রেষ্ঠ”। ১৯৮১ সালের ২৫ জানুযারী ৮০ বছর বয়সে লামচরিতে আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীর উদ্বোধনী ভাষণে কথাগুলো বলেছিলেন চারণ দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর। লাইব্রেরী অন্তঃপ্রাণ চারণ দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর ১৯০১ সালে ১৭ ডিসেম্বর বরিশাল নগর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরবর্তী, চরবাড়িয়া ইউনিয়নের লামচরি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতার নাম এন্তাজ আলী মাতুব্বর, আর মায়ের নাম রবেজান বিবি। জন্মের মাত্র ৪ বছর বয়সে আরজ আলী মাতুব্বর তাঁর পিতাকে হারান। খাজনা বকেয়ার দায়ে সম্পত্তি বলতে বসত ভিটে সমেত বিঘা পাঁচেক জমি দখল করে নেয় জমিদার। একেতো ক্ষুধার জ্বালা তার ওপরে নেই মাথা গোঁজার স্থান। ওই কঠিন সময়ে রাস্তার পাশে কলাপাতার ছাউনি দিয়ে ঘর বানিয়ে মা রবেজান বিবি আগলে রেখেছিলেন আদরের নিধি আরজ আলীকে। শতছিদ্র বলে বর্ষার রাতে সন্তানকে কোলে করে, নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে মায়ের। এমনি করে কঠিন পরিস্থির মধ্য দিয়ে বড় করে তুলেছিলেন আরজ আলী মাতুব্বরকে। লেখাপড়ার অদম্য আগ্রহ থাকলেও তৎকালীন সময়ে ওই গ্রামে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলনা। ১৯১৪ সালের দিকে মুন্সি আব্দুল করিম নামক এক ব্যক্তি নিজ বাড়িতে মক্তব খুলেছিলেন। এতিম বলে অবৈতনিক ছাত্র হিসেবে সেখানে পড়ার সুযোগ পান আরজ আলী। পড়ালেখার আগ্রহ দেখে জ্ঞাতি এক চাচা তাঁকে দু আনা দামের একখানা আদর্শ লিপি বই কিনে দিয়েছিলেন। পরম মমতায় আগলে রাখতেন বইখানি। এর এক বছর পর ১৯১৫ সালে ছাত্র বেতন অনাদায়ে মক্তবটি বন্ধ হয়ে যায়। এর সাথে সাথে সমাপ্ত হয় আরজ আলী মাতুব্বারের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার। ওইটুকু বিদ্যার জোরেই তিনি সোনাভান, জঙ্গনামা, মোক্তার হোসেন ইত্যাদি পুঁথি এবং বরিশালে অধ্যায়নরত ছাত্রদের পুরানো পাঠ্যবই সংগ্রহ করে পড়তে থাকেন। এরপর ১০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ১৯৩৬ সালে থেকে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরী এবং পরবর্তীতে ব্রজমোহন কলেজের লাইব্রেরীতে বই পড়ার সুযোগ পান।
তবে মায়ের মৃত্যুর পরবর্তী ঘটনাই তাঁকে বদলে দিয়েছিল পুরোটা। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যে মা তাঁকে বড় করে তুলেছিলেন, সেই মায়ের মৃত্যুর পর একখানা ছবি তুলে রাখতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি বরিশাল শহর থেকে একজন ফটোগ্রাফার এনেছিলেন। ফটো তোলা নাজায়েজ বলে বাদ সাধল গ্রামের ধর্মান্ধ জনতা। তারা খবরটি দ্রুত পৌঁছে দিয়েছিল নদীর অপর তীরের চরমোনাই পীরের বাড়িতে। তৎকালীন পীর সুযোগ পেয়ে ফতোয়া জারী করলেন, গ্রামের কেউ যেন জানাজায় অংশ না নেয়। শ্রুতি আছে আরজ আলী একাকী মায়ের গোর খুঁড়েছিলেন। আর এই ঘটনা থেকেই তাঁর জানার আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছিল। নিজেকে তৈরী করতে পেরেছিলেন বাংলার সক্রেটিস সম চারণ দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর নামে। ১৯৭৪ সালে ‘সত্যের সন্ধানে’ এবং ১৯৭৮ সালে লিখলেন ‘জীবন জিজ্ঞাসা’ নামক বই দুটি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ প্রকাশের পর স্বয়ং রবীন্দ্র ঠাকুর যেমন চমকে গিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি আরজ আলী মাতুব্বরের বই দুটি প্রকাশের পর দেশের বুদ্ধিজীবী মহলে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। তারা কেউ বিশ্বাস করতে চাননি বই দুটি গ্রামের একজন সহজ সরল কৃষকের লেখা। যিনি আজীবন গ্রামে কাটিয়েছেন। তাঁর ভিতরে কিভাবে ব্যতিক্রমী এই উন্নত ভাবনার জন্ম হলো। এজন্য আরজ আলী মাতুব্বরকে রীতিমত পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। আরজ আলী মাতুব্বরের কন্যা নুরজাহান বেগম বকুল জানান, তার বাবার কাজ কর্ম সকলের চোখে ব্যতিক্রম ছিল। সহজ সরল জীবন ধারণ করতেন। সব ক্ষেত্রেই তিনি হিসেব করে চলতেন। এমনকি কলাগাছ লাগিয়েও কত পয়সা আয় হয়েছে তা পর্যন্ত লিখে রাখতেন। দিনপঞ্জি লিখতেন প্রতিদিন। সেখানে গ্রামের অধিবাসীদের জন্ম-মৃত্যু পর্যন্ত লিখে রাখতেন। এই ব্যতিক্রমী চিন্তা থেকেই নিজ লাইব্রেরী ভবন সম্মুখে কবর নির্মাণ করেছিলেন তাঁর জীবদ্দশাতেই। কবর নির্মাণে তিনি প্রচলিত প্রথার বাইরে গিয়ে কবরের মেঝ পাঁকা করতে চাইলে, পাছে অদৃশ্য শক্তি ভয়ে নিজের ক্ষতির কথা চিন্তা করে রাজমিস্ত্রী পালিয়ে গিয়েছিলেন। অবশেষে নিজেই কবরের মেঝ পাঁকা করতে ঢালাইয়ের কাজ সারেন। মিশরীয় পিরামিডের কায়দায় তাঁর স্মৃতিচিহ্ন রাখতে ওই কবরে নখ, চুল কেটে বৈয়ামে ভরে রাখতেন। এখনো তা অক্ষত অবস্থায় রয়েছে কবরের মধ্যখানে। কবরের ঢাকনাটি তুললে এখনো দেখতে পাওয়া যায়। আর নিজের দেহ দান করে গিয়েছিলেন শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে। দীর্ঘ বছর পরে এই প্রথম আরজ আলী মাতুব্বর সংসদ চারণ দার্শনিকের ১১১ তম জন্ম দিন পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বরিশালে অশ্বিণী কুমার হলে অলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এখানে তারা আহবান জানিয়েছে সবাইকে উপস্থিত হবার জন্য।








আরজ আলী মাতুব্বর সম্পর্কে আরো বিস্তারিত প্রতিবেদন চাই
অনেক সুন্দর একটা পোষ্ট এমন যদি সবাই হতো তবে দেশটা পাল্টে যেত স্কুলে গিয়ে কিতাবী শিক্ষার প্রয়োজন হতো না।