সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। তারপরও মানুষ সৃষ্ট এই সমাজের নিয়ম-আচারগুলো বড্ড বৈষম্যপূর্ণ। সৃষ্টিকর্তার অনুপম সৃষ্টির এই মানুষকেই আবার সমাজের রুদ্ধ নিয়মের দাসত্ব মেনে নিতে হয়। এর অন্যতম বলি হলো নারী। এই পৃথিবীতে নারী হয়ে কেউ জন্মায় না। সামাজিক পরিবেশ, রীতিনীতি, দর্শন, সংস্কৃতি, প্রথাই নারী করে তোলে। এই সমাজ-সভ্যতার অগ্রগতির পেছনেও যে নারী সমান অংশীদার, সে কথা আজও আমাদের সমাজে পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আমাদের সমাজে আমরা অনেকক্ষেত্রেই নারীকে তার কর্মের জন্য বিভিন্ন শব্দে দোষী হিসেবে আখ্যায়িত করি। কিন্তু একই অপরাধ পুরুষ করলেও আমরা সেই পুরুষটি কে কখনো এই একই শব্দটি দিয়ে আখ্যায়িত করি না। দেখে মনে হয়, বাংলা অভিধানের এই শব্দগুলোর জন্মই হয়েছে নারীকে অবমাননার জন্য। নারীকে আমরা নীরব, বঞ্চিত, নিগৃহীত দেখতেই বেশি অভ্যস্থ। হঠাৎ প্রগতির পথে নারীর পথ চলা, আমাদের সমাজে অনেককেই স্তম্ভিত করে তোলে।
পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর যে সার্বিক অধস্তনতা তা একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত গোঁড়ামি আমাদের মনন জগতে শক্তভাবে বাসা বেঁধেছে। আবার জীবনের সবক্ষেত্রে পুরুষের অনিয়মতান্ত্রিক আধিপত্য বা প্রাধান্যের বিরুদ্ধে নারীর প্রতিবাদী চেতনাও নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে স্ফুরিত হয়েছে। বিকশিত হয়েছে। দীর্ঘকাল জুড়েই একদিকে যেমন নারীর প্রতি অমানবিক বৈষম্য ও নজিরবিহীন নৃশংসতা দেখা গেছে। অন্যদিকে তেমনি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীর অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও উপেক্ষা করা যায়নি। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নারীর ক্ষমতায়ন অথবা পুরুষের উপর নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা দূর করার কোন প্রচেষ্টাকে পুরুষতন্ত্র ভাল ভাবে দেখেনি। এই প্রচেষ্টাকে ঠেকাতে কখনও পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো এবং কখনও দুটিই ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে নারীর প্রতি আরোপিত সামাজিক অনাচার ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নারীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সাহস জোগানোর ক্ষেত্রেও কোন কোন মহাপ্রাণ পুরুষের অবদান বা ভূমিকাও একেবারে উপেক্ষার নয়। শিক্ষা লাভের মাধ্যমে নারীর আত্মপ্রত্যয় প্রতিষ্ঠার লড়াইকে এগিয়ে নিতে ভারতবর্ষেই ভূমিকা পালন করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। আবার সতীদাহ প্রথা বন্ধ এবং বিধবা বিবাহ প্রচলনের ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান অবিস্মরণীয়।
এখন সময়ে আবর্তনে নারীর প্রতি মানুষের মানসিকতা ও ভাবনার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। ১৯১০ সালের ৮ মার্চ মহীয়সী নারী ক্লারা জেৎকিনের নেতৃত্বে কোপেনহেগেনে নারী শ্রমিকদের বিশাল সমাবেশে যে উদাত্ত আহ্বান তিনি জানিয়ে ছিলেন। সেই আহ্বানই আজ বিশ্বের সমগ্র নারী জাতির অধিকার আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিকভাবে নারীকে উদ্বুদ্ধ করছে।
নারীর পশ্চাৎপদতা, নারীকে মানুষ হিসেবে তৈরি হবার অনুপ্রেরণা, অধিকার সুরক্ষায় নারীর আত্ম-সচেতনতার এই উত্তরণ একদিনে ঘটেনি। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর জাতীয় রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বামপন্থী রাজনীতিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। কৃষক আন্দোলনের হেনা দাস, চারুলতা ঘোষ, তেভাগা আন্দোলনের ইলা মিত্রসহ অনেকেই শুধু নারী মুক্তি নয় বরং জনগণের মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন। এদিকে স্বাধীন বাংলাদেশে নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া তার অনন্য মেধার সবটুকুই উৎসর্গ করেছেন নারী মুক্তির আন্দোলনে। কুসংস্কার গ্রস্থ এবং পশ্চাৎপদ

সুমিত বণিক।। কিশোরগঞ্জ
সমাজে নারী আন্দোলনের মাধ্যমে জাগরণ সৃষ্টি করেছেন। আর এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে বাংলার নারীর অগ্রগতিতে তথা বাংলার ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে তারুণ্যদীপ্ত নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীন। বাংলার নারীরা আজ প্রমাণ করেছে, তারাও পুরুষের চেয়ে কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই।
আশার কথা হলো, দেশে নারী অগ্রগতি ও ক্ষমতায়নে সরকারি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ব্যাপক ও বহুমাত্রিক উপায়ে আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার সাথে রয়েছে বেসরকারী নারী, মানবাধিকার আন্দোলন ও উন্নয়ন সংস্থার বা এনজিও’র অব্যাহত প্রচেষ্টা।
আমাদের প্রত্যাশা, অধিকার ও সমতার ভিত্তিতে নারীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, বিরাজমান সকল প্রকার বৈষম্যের বিলোপ সাধন করে নারী হবে নীতি নির্ধারন ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার একজন পূর্ণ অংশীদার।
আজো নারী সমাজের অগ্রগতি ও নারীর ক্ষমতায়নে বড় বাঁধা ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতা। এসব জটিলতা কুটিলতা, ভ্রান্তি, অপব্যাখা পেরিয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে আসতে হবে। নারীর প্রতি সামাজিক ও পারিবারিক সহিংসতা রোধে ধর্মান্ধতা কে পরিহার করে ধর্মীয় নির্দেশ এর সঠিক চর্চা করতে হবে।
যে পুরুষতান্ত্রিক চেতনা এবং ধারণা মানুষ লালন করে তা পরিবর্তনে চাই পরিবার থেকেই জেন্ডার সংবেদনশীল ধারণা, চেতনা, শিক্ষা সর্বোপরি ইতিবাচক মানসিকতার সঠিক অনুশীলন। তবেই প্রতিষ্ঠিত হবে নারীর সমসুযোগ ও সমঅধিকার। আর দেশের উন্নয়নের প্রথম শর্ত হিসেবে নারীর ক্ষমতায়ন ও টেকসই বাস্তবায়নের জন্য তাই বলা হয়ে থাকে:
‘নারী কে তার প্রাপ্য দিলে
দেশ ও দশের সুফল মিলে।’






