মোঃ শাহজালাল। পঞ্চগড়।।
একটা লোক আইয়া কইলো ২৫টা লোক আপনার হাতে সোর্পদ করলাম হেরা মুক্তিযোদ্ধা। আপনি হেগো সাহায্য করবেন। তহন আমি হেগো রাস্তা ঘাট সমস্থ দেহাইছি। ৯ মাস যুদ্ধ করেছি সারা রাইত জমিনের মধ্যে থাইকা পাকসেনাগোর উফর হামলা করছি। দ্যাশ স্বাধীন হলো, ভাগ্যে কিছুই জুটলো না, অহন ভিক্ষা কইরা জীবন চালাই। হে সময় যে ব্যাডারা চুরি করলো, ডাহাতি করলো, আগুন জ্বালাইল, তারাই এহন কইয়া বেড়াই হেরা নাকি বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে শত্রুর কাছে কিছুতেই হার মানেননি মুক্তু মিঞা। কখনো সম্মুখ আবার কখনো গেরিলা যুদ্ধ। মরণপণ সে লড়াই। শত্রুকে পরাজিত করে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর মুক্তু মিঞা দীর্ঘ নয় মাসের ত্যাগের ফসল এই স্বাধীন বাংলাদেশ। আমাদের দিয়েছে স্বাধীনতা, লাল সবুজ খচিত একটি পতাকা। বিনিময়ে কি পেয়েছেন তিনি ? মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকহানাদারদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধের এই যোদ্ধা স্বাধীনতার ৪০ বছরে কি পেলো ?
পঞ্চগড়ের সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের মহারাজা পাড়ের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মুক্তু মিঞার (৮৫) দিন কাটছে বিনা চিকিৎসায় অর্ধাহারে অনাহারে। মৃত্যুর পর লাল সবুজ পতাকায় আচ্ছাদিত রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হবে। ৭১ এর অদম্য, অপরাজিত, জীবনবাজি রাখা এ সৈনিক কেন জীবনে পরাজয় মেনে নিলেন? যা জানা গেলো, তা বড়ই কষ্টকর ও বেদনাদায়ক।
৭১ এর শুরুতে পঞ্চগড় ৬ নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানী কমান্ডার মাহবুব আলম অমরখানার ভিতরগড় এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে সেদিন এই মুক্তু মিঞার কাছে ২৫ জনের একটি দলকে তুলে দিয়েছিল মুক্তু মিঞার হাতে । এসময় মুক্তিযোদ্ধাদের গাইড হিসেবে কাজ করতো মুক্তু মিঞা। রাজাকারদের গতিবিধি পাকসেনাদের অবস্থান সহ রাতের অন্ধকারে শত্রুর অবস্থান জানতে দীর্ঘ ৯ মাস কাজ করেছে এই মুক্তু মিঞা। যুদ্ধ শেষ হলো। স্বাধীন হলো বাংলাদেশ। মুক্তু মিঞার । পরিবার নিয়ে অভাবের সংসার। এক চিলতে ভিটে বাড়ি ছাড়া জায়গা জমি নেই। নদীতে পাথর তুলে কখনোবা দিনমজুরী করে সংসার চালাতেন তিনি।
তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙ্গা চোরা বেড়ার ছনের ঘরের এক পাশে ছোট্ট একটা কুটুরিতে মুক্তু মিঞার বসবাস। বার্ধক্য সহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে কোন কাজকর্ম করতে না পেরে ভিক্ষা করে জীবন চালায় সে। প্রতিদিনের মতো ভিক্ষা করে বাড়ী ফিরছিল সে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে হুহু করে বাতাস ঢুকছে। ছেড়া- ময়লা কাপড় চোপড়। মটর সাইকেলে শব্দে বিছানা ছেড়ে উঠলেন। কিন্তু দাঁড়াতে পারছেন না। শরীরের নীচের অংশটা অবশ হয়ে গেছে । নির্বাক নিথর। চোখ দিয়ে শুধু অনবরত পানি ঝরছে। আক্ষেপ করে মুক্তু মিঞা বলেন, স্বাধীনতার এই ৪২ বছরে তার ভাগ্যে কিছুই জটেনি। ৭১ এ যারা ডাকাতি করেছে, অন্যের সম্পদ লুট করেছে, রাজাকার আলবদরদের সাথে ফূর্তি করেছে তারাই এখন নিজেদের বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করে।
পাশের আত্মীয় স্বজনরা বলেন, গত কয়েক বছর এই মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষা করে জীবন চালায় মাঝে মধ্যে তারা সহায়তা করে তাকে। । মুক্তু মিঞা একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। শুনেছি এই সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক কিছু করছে। কিন্তু তার জন্য কিছুই করছে না। কেউ খোঁজও নিতে আসে না।
পঞ্চগড় জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার এসএম লিয়াকত আলী বললেন, মুক্তু মিঞা একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তার নিজের কারণেই মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্তি হয়নি। ইতিমধ্যে জেলার ৮২ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা সরকারের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। এসব বিবেচনা হলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা উপকৃত হবে।

মন্তব্য করুন

Designed and Developed By Domain Technologies Ltd.