
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯, বাংলাদেশের সবচেয়ে যুগান্তকারী একটি আইন। নতুন রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত যত নতুন আইন তৈরি হয়েছে , তার মধ্যে এই আইনটিই রাষ্ট্রের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব স্থাপনে সবচেয়ে কার্যকরী একটি হাতিয়ার। তাই তথ্য আইনের কার্যকারিতা সম্পর্কে সকল স্তরের জনগণের পরিষ্কার ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরী। বিশেষ করে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত, বঞ্চিত ও পিছিয়ে থাকা মানুষরা যাতে এ আইনটি কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিজেদের ক্ষমতা খাটিয়ে সমাজে তাদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পারে এবং নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে পারে, তাই এই আইনটি তাদের খুব ভালভাবে জানা দরকার। তারা যদি বুঝতে পারে যে ব্যবসায়ী, দোকানদার বা দুধওয়ালার কাছ থেকে তারা যেমন হিসেব চাইতে পারে, সরকারের কাছ থেকেও তেমনি হিসেব চাইতে পারে। সরকারের কাছ থেকে এই হিসেব চাওয়া ও পাওয়া তাদের মৌলিক অধিকার, যাকে এখন আইনের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সারাদেশের স্থানীয় পর্যায়ের অফিস থেকে শুরু করে মাননীয় রাষ্ট্রপতির অফিস পর্যন্ত সর্বস্তরের সরকারী অফিস থেকেই জনগণ নানাবিধ তথ্য এখন আইনত: চাইতে ও পেতে পারে, যা আগে ভাবাই যেতনা।
তথ্য অধিকার আইনটি (সংক্ষেপে তথ্য আইন) জাতীয় সংসদ কতৃক প্রণীত হয়ে ২০০৯ সনের ১লা জুলাই থেকে সরকারীভাবে কার্যকর হয়েছে। তবে যেকোন আইনই সঠিকভাবে প্রয়োগের জন্য কিছু বিধিমালার প্রয়োজন হয়। সেই বিধিমালাও আইনের ক্ষমতাবলে সরকার তথ্য কমিশনের সাথে পরামর্শক্রমে প্রণয়ন করেছে। আইনটি প্রয়োগে আইনত: আর কোন বাধা নেই। আর এই প্রয়োগের মাধ্যমেই আইনটির কার্যকারীতা ও অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে পারে জনগণই। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে শুধু বাংলাদেশের নাগরিকরাই এই আইনটি ব্যবহার করতে পারবে। তাই জনগণ বলতে শুধু বাংলাদেশের নাগরিকদের বোঝানো হয়েছে।
তথ্য আইনের মাধ্যমে জনগণ সরকারের কাছ থেকে এবং কিছু বেসরকারী প্রতিষ্ঠান (এনজিও)- যারা সরকারী বা বিদেশী পয়সায় পরিচালিত – তাদের কাছ থেকে তাদের কাজ ও দায়িত্ব সংক্রান্ত এমন সব তথ্য চাইতে পারে, যা তারা আগে জনগনকে দিত না বরং তাদের কাছ থেকে গোপন রাখত। এখন তথ্য আইনের মাধ্যমে সেসব তথ্য জনগণের জানার অধিকারের আওতায় আনা হয়েছে। তাই মনে রাখতে হবে, যেসব তথ্য সরকার আগে জনগণকে দিতে বাধ্য ছিল না, অর্থাৎ যা অপ্রকাশিত থাকতো, এই আইনের মাধ্যমে সেসব তথ্য জনগণকে দিতে সরকারকে বাধ্য করা হয়েছে। আর এটা করা হয়েছে যাতে জনগণের কাছে সরকারের কাজ স্বচ্ছ হয় এবং সরকার জনগণের ন্যায্য অধিকার সম্বন্ধে সচেতন এবং নিজস্ব দায়িত্ব সম্বন্ধে সজাগ ও সতর্ক থাকে।
সহজ কথায় বলা যায়, যেসব তথ্য সরকারী কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত অর্থাৎ সরকার কিভাবে কাজ করে ও সিদ্ধান্ত নেয়, কিসের ভিত্তিতে ও কি প্রক্রিয়ায় সিদ্দান্ত নেয়, সেসব তথ্য সরকার সাধারণতঃ জনগণকে দিতে চায় না। এসব তথ্য জনগণ জানলে তারা সরকারী কর্মকান্ডের ভেতরের যাবতীয় খবর (তথ্য) জেনে যাবে এবং তার ফলে সরকারী কাজে কোন অস্বচ্ছতা, অসতর্কতা বা দূর্নীতি থাকলে তা ফাঁস হয়ে যাবে এবং তাতে সরকারের ও সরকারী কর্মকর্তাদের অসুবিধে হবে এবং জনগণের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। তাই এসব তথ্য সরকার সাধারনত: জনগণের কাছে গোপন রাখতে চায়। এইসব তথ্য জানলে জনগণ সরকারের কাজ সম্পর্কে জানতে পারে এবং এর মাধ্যমে সরকারের কাজে স্বচ্ছতা, সততা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
তথ্য আইনের ২(চ) নম্বর ধারায় ‘তথ্য’ বলতে কী বোঝায় তার সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘তথ্য’ মানে সরকারী এবং সরকারী বা বিদেশী অর্থে পরিচালিত বেসরকারী (এনজিও) সব প্রতিষ্ঠানের গঠন প্রণালী, ব্যবস্থাপনা কাঠামো, অফিসের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত কাগজপত্র, ফাইল, বই, নকশা, মানচিত্র, চুক্তি, তথ্য-উপাত্ত, লগ বই, আদেশ, বিজ্ঞপ্তি, দলিল, নমুনা, চিঠি, রিপোর্ট, খরচের হিসেব, প্রকল্প প্রস্তাব, ছবি, ফিল্ম ইত্যাদি সব কিছুই বোঝায়। অর্থাৎ সরকার যেসব পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি ক’রে সিদ্ধান্ত নেয় তার বিবরণ এবং সরকারী কাজে যেসব দলিলপত্র ব্যভহার হয়, সরকারী কাজের মাধ্যমে যেসব দলিল, চিঠি, ফাইল ইত্যাদি তৈরি হয়, তা সবই তথ্য। আর এও দেখা যাচ্ছে যে, তথ্য আইনের দৃষ্টিতে ‘তথ্য’ ও সাধারণ অর্থে ‘তথ্যের’ মানে এক না। আমরা সাধারণ অর্থে ‘তথ্য’ বলতে সবরকম প্রকাশিত খবর, সংবাদ, সমাচার, বিবরণ, বৃত্তান্ত, প্রতিবেদন, দলিল, বই ইত্যাদি বুঝি। আর তথ্য অধিকার আইনের অর্থে ‘তথ্য’ হচ্ছে সরকারের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত অপ্রকাশিত সব তথ্যাদি। এখানে অপ্রকাশিত শব্দটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রকাশিত কোন তথ্য এই আইনের আওতায় পড়ে না। কারণ প্রকাশিত তথ্য জানার জন্যে অধিকার প্রয়োগ করে আদায় করতে হয় না। শুধু সংগ্রহ করতে হয়।
তথ্য আইনের আওতায় পড়ে এরকম তথ্যের উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আপনার গ্রামের রাস্তা কবে তৈরী হবে বা মেরামত হবে সেই সম্বন্ধে সরকারী সিদ্ধান্ত বা সিদ্ধান্তহীনতা একটি তথ্য; আপনার বাড়িতে কবে বিদ্যুৎ পৌঁছাবে একই অর্থে একটি তথ্য; সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কী ধরণের সুযোগ সুবিধা থাকা উচিত তা একটি তথ্য; সরকারী স্কুলে শিক্ষক আসেন না কেন, তা একটি তথ্য; বার্ধক্যভাতা বা ভিজিএফ কার্ড প্রদান করার প্রক্রিয়া কি তা-ও তথ্য। এসব তথ্য জনগণের কাছে কত জরুরী তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তথ্য আইনের গোড়াতেই বলা হয়েছে : “জনগণ প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক ও জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক”। তাই বলা যায় যে, এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে: রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা, সরকারী কাজে স্বচ্ছতা ও সততা আনা, সরকারের এবং সরকারী কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, সরকারী কাজে দুর্নীতি বন্ধ করা এবং সত্যিকার অর্থে দেশে সুশাসন ও গণতন্ত্র স্থাপন করা। যেসব দেশের নাগরিকরা তথ্য আইন ব্যবহারের ব্যাপারে যত বেশি সচেতন এবং দায়িত্বশীল, সেইসব দেশেই গণতন্ত্র ও সুশাসন তত বেশি শক্তিশালী হয়, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং সরকার জনগণের প্রতি দায়িত্ববান হয়। তথ্য আইনের মাধ্যমে জনগণ সরকারী কাজ সম্বন্ধে জানতে পারে এবং দেশের দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব ও ভূমিকা পালন করতে পারে এবং একই সঙ্গে নিজেদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারে।
তথ্য অধিকার আইনে বলা হয়েছে যে, এই আইনের বলে জনগণ সব রকম সরকারী কতৃপক্ষ এবং কিছু কিছু বেসরকারী কতৃপক্ষের কাছ থেকে ওপরে বর্ণিত যাবতীয় তথ্য এখন আইনত: চাইতে পারবে। আর কতৃপক্ষ বলতে আইনের ২(খ) ধারায় ‘কতৃপক্ষের’ যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাতে মোটা দাগে বলা যায় যে, যেসব সংস্থা জনগণের (পাবলিক) বা বিদেশী পয়সায় পরিচালিত হয়-- যেমন সবরকম সরকারী দপ্তর ও কিছু কিছু এনজিও—সেইসব সংস্থার কতৃপক্ষ এই সংজ্ঞার আওতায় পড়ে। তথ্য আইনে এইসব কতৃপক্ষকে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য প্রদানে বাধ্য করা হয়েছে। আইনের ধারা ৪ এ বলা হয়েছে, দেশের প্রত্যেকটি নাগরিক কতৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাবার অধিকারী এবং প্রত্যেক কতৃপক্ষ প্রত্যেক নাগরিককে তথ্য প্রদানে বাধ্য। তবে মনে রাখতে হবে, ব্যক্তিমালিকানাধীন সংস্থার কতৃপক্ষ অথবা সরকার বা বিদেশের অর্থ দ্বারা পরিচালিত হয় না সেই রকম এনজিও এই সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না।
এই আইন অনুযায়ী প্রত্যেক সরকারী কতৃপক্ষ ও নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারী কতৃপক্ষ তাদের অফিসে একজন করে কর্মকর্তা নিয়োগ দেবে যার কাছে জনগণ তথ্য চেয়ে লিখিতভাবে অনুরোধ করতে পারবে। এইসব কর্মকর্তাকে “তথ্য কর্মকর্তা” নাম দেয়া হয়েছে। আইনের ধারা ১০ অনুযায়ী, এই আইন কার্যকর হবার ৬০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ২০০৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে প্রত্যেক কতৃপক্ষের ১ জন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেবার কথা। ধারা ১০(২) অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের ৬০ দিনের মধ্যে জনগণকে তথ্য সরবরাহ করা শুরু করতে হবে এবং ধারা ১০(৪) অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম, পদবী, ঠিকানা ইত্যাদি এই আইনের দ্বারা সৃষ্ট তথ্য কমিশনকে (যার সম্বন্ধে নিচে বলা হয়েছে) জানাতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত সরকারী কার্যালয়গুলোতে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়নি। তা সত্ত্বেও এইসব সংস্থার কাছ থেকে তথ্য চাইতে জনগণের আইনতঃ কোন বাধা নেই। আইনের ধারা ২(ঘ) অনুযায়ী “তথ্য প্রদান ইউনিট”- বলতে সরকারের কোন মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কার্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত বা অধীনস্ত কোন প্রধান বা বিভাগীয় বা আঞ্চলিক বা জেলা বা উপজেলা কার্যালয় বোঝায়। অর্থাৎ সর্বনিম্ন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ সরকারী অফিসের কাছ থেকেই তথ্য চাওয়া যাবে।
এই আইনে কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া-- যে ব্যাপারে পরের অংশে বিস্তারিত বলা হয়েছে-- জনগণ সরকারী কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত ও সরকারের কাছে আছে বা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন সব তথ্যই চাইতে পারবে। এসব তথ্য জনগণ সরকারী ফাইল, দলিল, রেকর্ড ইত্যাদি দেখার মাধ্যমে অথবা প্রয়োজনে সরেজমিনে পরীক্ষার মাধ্যমে পেতে পারে। ফাইল দেখে তথ্য নোট করে আনতে পারে, ফাইল কিংবা দলিলের কপি সংগ্রহ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, কোন কতৃপক্ষ শুধু যেসব তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে সেসব তথ্যই দিতে পারবে, তৈরি করা বা বানোয়াট কোন তথ্য দিতে পারবে না। তথ্য ঠিক যেভাবে আছে সেইভাবেই দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে সরকারী কোন চিঠি কেউ দেখতে চাইলে, শুধুমাত্র সেই চিঠিই তাকে দেখতে দিতে হবে। কোন সারসংক্ষেপ বা অন্য কোন আকারে দিলে চলবে না।
যদিও তথ্য আইনে সরকারী বেশিরভাগ তথ্যই জনগণের জানার আওতায় আনা হয়েছে, তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম করা হয়েছে। অর্থাৎ কিছু কিছু তথ্য সরকার এখনও গোপন রাখতে পারবে। এইসব তথ্য কোন কতৃপক্ষ কোন নাগরিককে দিতে বাধ্য হবে না। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেঃ বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বের ক্ষতিসাধন করতে পারে; অন্য কোন দেশ বা আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে; কোন তথ্য প্রকাশের ফলে অন্য কোন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বা জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এই ধরনের তথ্য। মোটকথা যেসব তথ্য প্রকাশের ফলে দেশ বা দশের ক্ষতি হতে পারে বা কোন মানবাধিকার লঙ্ঘন হতে পারে এরকম তথ্য কোন কতৃপক্ষ কাউকে দিতে বাধ্য নয়। কোন কোন তথ্য কতৃপক্ষ কাউকে দিতে বাধ্য নয় তার সম্পূর্ণ তালিকা আইনের ধারা ৭ এ উল্লেখ করা হয়েছে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে তথ্য না দেবার এই বিধান থাকির ফলে সরকারী কয়েকটি কতৃপক্ষকেও তথ্য প্রদান থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাদের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য নয় এবং জনগণ তাদের কাছ থেকে তথ্য চাইতে পারবে না। আইনের ধারা ৩২ এ বলা হয়েছে যে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাজে নিয়োজিত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই আইন কার্যকর হবে না। এদের মধ্যে এনএসআই, ডিজিএফআই, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা ইউনিট, সিআইডি, এসএসএফ, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, র্যাবের গোয়েন্দা সেল, রাজস্ব বোর্ডের গোয়েন্দা সেল অন্তর্ভক্ত। তথ্য আইনের প্রথম তফসিলে এইসব সংস্থার তালিকা দেয়া হয়েছে।
তবে ধারা ৩২(২) এ এও বলা হয়েছে যে, যেসব সংস্থাকে তথ্যপ্রদানে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের কোন তথ্য যদি দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত হয়, তাহলে সেসব সংস্থা সেসব তথ্য আবেদনকারীকে দিতে বাধ্য থাকবে। অর্থাৎ নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে কোন সংস্থা মানবাধিকার বা দুর্নীতি সম্পর্কিত কোন তথ্য প্রদানে অস্বীকার করতে পারবে না।
তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের ফলে দেশে প্রচলিত অন্য কোন আইনের কোন ধারার সঙ্গে এই আইনের কোন ধারার বিরোধ তৈরি হলে, তথ্য আইনই প্রাধান্য পাবে বলে আইনে বলা হয়েছে। যেমন, দেশের বিদ্যমান “দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন ১৯২৩” অনেকটাই অকেজো হয়ে গেছে এই তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের ফলে। অর্থাৎ আগে সরকার এই আইনের অজুহাত দেখিয়ে যেসব তথ্য গোপন রাখতে পারতো এখন আর তা পারবে না। (ধারা ৩)
তথ্য অধিকার আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী প্রত্যেক কতৃপক্ষকে তাদের যাবতীয় তথ্য এখন থেকে এমনভাবে মজুত রাখতে হবে যাতে কেউ চাইলে তাকে সেখান থেকে সহজে সেসব তথ্য দেয়া যায়। অর্থাৎ তাদের ক্যাটালগ/ইনডেক্স ইত্যাদি তৈরি করতে হবে।
তথ্য অধিকার আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী আইনটি চালু হবার পর থেকে প্রত্যেক কতৃপক্ষ কী কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, কী কী কাজ করছে বা করতে চাইছে, তা নাগরিকদের জানানোর জন্যে নিয়মিত প্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা করবে। তাছাড়া প্রত্যেক কতৃপক্ষ তাদের সারা বছরের কাজের তথ্য দিয়ে একটি বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করবে। তাতে নাগরিকদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ সব রকম কাজের বিবরণ ও সেই সংক্রান্ত সব তথ্য ও ব্যাখ্যা থাকবে।
কেউ কোন কতৃপক্ষের কাছ থেকে কোন তথ্য জানতে চাইলে তাকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে আবেদন করতে হবে। ই-মেইলের মাধ্যমেও এই আবেদন পাঠানো যাবে। আবেদন পত্রে আবেদনকারীর নাম ঠিকানা ইত্যাদি লিখতে হবে। তাছাড়া যে তথ্যের জন্য আবেদন করা হচ্ছে তার সঠিক বর্ণনা, কীভাবে আবেদনকারী সে তথ্য গ্রহণ করবে অর্থাৎ ফাইল দেখার মাধ্যমে, না কি ফাইলের অনুলিপি নিয়ে, বা অন্য কোন উপায়ে নেবে তা জানাতে হবে। আবেদন করার জন্য মুদ্রিত ফরমের কথা আইনের ধারা ৮(৩) এ বলা হয়েছে। তবে তাতে এ-ও বলা হয়েছে যে যতদিন মুদ্রিত ফরম পাওয়া না যায় ততদিন সাদা কাগজে বা ইমেইলে লিখেও আবেদন করা যাবে। তথ্য আইনে কোথাও পরিষ্কার করে বলা হয়নি যে কোন ব্যক্তিই শুধু তথ্যের জন্য আবেদন করতে পারবে, কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা বা গোষ্ঠী আবেদন করতে পারবে না। যেহেতু কোথাও না বলা হয়নি তাই ধরে নেয়া যেতে পারে যে অনেকে মিলে আবেদন করতে কোন অসুবিধে নেই। আইনের ধারা ৮ উপধারা ৫ “ব্যক্তি বা ব্যক্তি-শ্রেণী” কথার উল্লেখ এই ব্যাখ্যার সমর্থন করে বলে মনে হয়।
তথ্য পাবার জন্যে আবেদনকারীকে যুক্তিসংগত মূল্য পরিশোধ করার কথা আইনের ধারা ৮(৪)(৫)(৬) এ বলা হয়েছে। তবে তা সরকার তথ্য কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করে নির্ধারণ করবে। যতদিন তা না করা হয় ততদিন পর্যন্ত এবং দরিদ্রজনেরা সবসময়ই বিনামূল্যে তথ্য পাবে। তবে ফটোকপি ইত্যাদি সব খরচ আবেদনকারীকেই বহন করতে হবে।
আইনের ধারা ৯ এ বলা হয়েছে যে, তথ্যের জন্য কোন নাগরিকের কাছ থেকে অনুরোধ পাবার ২০ দিনের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সে তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে সরবরাহ করতে হবে। তবে যে তথ্য চাওয়া হয়েছে তা যদি অন্য কোন ইউনিট বা কতৃপক্ষের কাছ থেকে যোগাড় করতে হয় তাহলে এই সময় ৩০ দিন পর্যন্ত বেড়ে যাবে। আর যদি কোন কারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অনুরোধকৃত তথ্য প্রদান করতে না পারে তাহলে তার কারণ উল্লেখ করে আবেদন পাবার ১০ দিনের মধ্যে তা অনুরোধকারীকে জানাতে হবে। অবশ্য আইনের ধারা ৯(৪) এ এও বলা হয়েছে যে যদি কোন তথ্য কোন ব্যক্তির জীবন-মৃত্যু, গ্রেপ্তার বা কারাগার থেকে মুক্তি সংক্রান্ত হয় তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে অন্ততঃ প্রাথমিক তথ্য সরবরাহ করতে হবে। তথ্য দেবার এই সময়সীমার মধ্যে যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তথ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হন তাহলে ধরে নেয়া হবে যে তিনি এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার বিধান করা হয়েছে। আগেই বলা হয়েছে যে, অনুরোধকৃত তথ্য প্রদানে যদি কতৃপক্ষের কোন ব্যয় হয় তাহলে সে ব্যয় অনুরোধকারীকে বহন করতে হবে এবং তার ন্যায্যমূল্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্ধারণ করবেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা প্রকৃত মূল্যে হবে অর্থাৎ ফটোকপি, প্রিন্ট আউট ইত্যাদিতে যে ব্যয় হয় শুধু সে ব্যয়ই অনুরোধকারীকে বহন করতে হবে। কোন ইন্দ্রিয় প্রতিবন্ধীর (যেমন, অন্ধ, বধির) ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে তথ্য লাভ করতে যাবতীয় সহায়তা করতে আইনতঃ বাধ্য করা হয়েছে।
কোন ব্যক্তি তাঁর অনুরোধকৃত তথ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না পেলে অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদন পাননি বা আবেদন হারিয়ে গেছে বলে জানালে বা তাঁর দেয়া সিদ্ধান্তে খুশি না হলে তিনি পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে যে সংস্থার কতৃপক্ষের (ইউনিটের) কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে, আইনের ধারা ২৪ অনুযায়ী সেই সংস্থার বা ইউনিটের ঠিক ওপরের কার্যালয়ের কাছে আপিল করতে পারবেন। এই আপিলে মূল আবেদন পত্রের কপি ও তার সঙ্গে কোন সংযুক্তি থাকলে তা জুড়ে দিতে হবে। আইনের ধারা ২(ক) তে “আপিলের কতৃপক্ষের” সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এই আপিল পাবার ১৫ দিনের মধ্যে আপিল কতৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজন মত ব্যবস্থা নেবার নির্দেশ দেবেন অথবা আপিল আবেদনটি অগ্রহণযোগ্য বিবেচিত হলে তা খারিজ করে দিতে পারবেন।
তথ্য আইন ঠিকমত প্রয়োগ হচ্ছে কি না তা তদারকির জন্যে এবং আইন অমান্য হলে তার প্রতিবিধানের জন্য একটি তথ্য কমিশনের ব্যবস্থাও আইনে আছে। আইনের ধারা ১১ এর ভিত্তিতে সরকার ইতিমধ্যে একটি তথ্য কমিশন স্থাপন করেছে। অন্যান্য কাজের মধ্যে কমিশন জনগণের কাছ থেকে এই আইন প্রয়োগ সংক্রান্ত ব্যপারে কোন অভিযোগ থাকলে তা গ্রহণ ক’রে সে ব্যাপারে অনুসন্ধান ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করবে। যেমন, সময়মত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ না করা, আবেদনপত্র গ্রহণ না করা, সময়মত জবাব বা তথ্য না দেয়া, অযৌক্তিক মূল্য দাবী করা, অসম্পূর্ণ, ভ্রান্ত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করা ইত্যাদি। এরই মধ্যে সরকার একজন প্রধান তথ্য কমিশনার এবং ২ জন তথ্য কমিশনার নিয়োগ দিয়েছেন। তথ্য কমিশনের ক্ষমতা ও কার্যাবলীর বিবরণ আইনের ধারা ১৩ তে বিশদভাবে দেয়া হয়েছে।
কোন ব্যক্তি সময়মত ওপরে উল্লেখিত আপিলের কোন রায় না পেলে বা তার কাছে আপিলের রায় সন্তোষজনক মনে না হলে তিনি সরাসরি তথ্য কমিশনের কাছে অভিযোগ করতে পারবেন, যা আগেই বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে তাঁকে অভিযোগের সাথে সম্পৃক্ত সব কাগজপত্র অভিযোগপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে। আর তা হাতে হাতে পৌঁছে দেয়া বা রেজিষ্ট্রি ডাকে পাঠানোই ভালো। আইনের ধারা ২৫ এ কী কী কারণে এই অভিযোগ করা যাবে তার উল্লেখ আছে। তথ্য কমিশন এই ধারার উপধারা ১১ এর ভিত্তিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যে কমিশন অভিযোগ খারিজ করতে পারে কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নতুনভাবে পদক্ষেপ নিতে বলতে পারে। এছাড়াও কমিশন যদি মনে করে যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই আইন অমান্য করেছেন তাহলে তাঁকে জরিমানা করতে পারবে। আইনের ধারা ২৭ এ জরিমানা সংক্রান্ত বিধানের কথা বলা হয়েছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, কোন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য প্রদান বা এই বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত জানাতে না পারলে কিংবা ভুল, অসম্পূর্ণ, বিভ্রান্তিকর বা বিকৃত তথ্য প্রদান করলে কিংবা তথ্য প্রদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাকে তথ্য দেবার জন্য নির্দিষ্ট দিনের পর থেকে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে অনধিক ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা তথ্য কমিশন আরোপ করতে পারবে।
আইনের ধারা ২৯ অনুযায়ী তথ্য কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কেউ কোন আদালতে আপিল করতে পারবে না। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে তথ্য কমিশন একটি দেওয়ানী আদালতের মত ক্ষমতা প্রয়োগ করে কোন ব্যক্তিকে সমনজারী করে কমিশনের সামনে হাজির হবার জন্যে বাধ্য করে তথ্য-প্রমাণ, দলিলপত্র, সাক্ষ্য ইত্যাদি তলব করতে পারবে। অর্থাৎ তথ্য কমিশনকে একটি দেওয়ানী আদালতের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তবে সংবিধানের ১০২ ধারা অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ কোন ব্যক্তি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করতে পারবে।
অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের তথ্য অধিকার আইনে কিছু ঘাটতি আছে, তা অবশ্যই বলা যায়। যেমন, আদালতে যাবার সুযোগ, তৃতীয় পক্ষের সাথে জড়িত তথ্য প্রকাশের ব্যাপারে অস্পষ্টতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা-বিষয়ক তথ্য সমূহের চিরস্থায়ীত্ব ইত্যাদি। তবে আইনে যেটুকু দেয়া হয়েছে তা-ই ভালোভাবে চালু হোক। পরে ঘাটতিগুলো পূরণ করার দিকে নজর দেয়া যাবে। আইনটি চালু করার ব্যাপারে দেশের সকল নাগরিকেরই যে দায়িত্ব আছে তা সকলকে ভালোভাবে বুঝতে হবে।
Designed and Developed By Domain Technologies Ltd.