হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব রথযাত্রা। আগামী ২১ জুন প্রথম রথযাত্রা এবং ২৯জুন উল্টো রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। ভগবান শ্রী কৃষ্ণের অপর নাম শ্রী শ্রী জগন্নাথ ও শ্রী শ্রী গোপীনাথ। কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলায় ভোগবেতাল গ্রামে অবস্থিত জেলার অন্যতম প্রত্নসম্পদ ঈশা খাঁ ও রাজা নব রঙ্গের ঐতিহাসিক হিন্দু ধর্মীয় তীর্থস্থান শ্রী শ্রী গোপীনাথ মন্দির। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। রাজার স্বপ্নাদৃষ্ট হয়ে কোটামন দীঘি ও বাউল সাগর নামে নদীর তীর হতে কৃষ্ণবর্ণের দু’টি নিম কাঠের খন্ড দিয়ে গোপীনাথ বলরাম ও শুভদ্রার মূর্তি তৈরী করে মন্দিরে স্থাপন করে। কিন্তু এর সংস্কার করেন ঈশা খাঁ। এই জায়গাটির নাম ভোগবেতাল। নামটির জন্মদাতা ঈশা খাঁ। এই নিয়ে এলাকায় এখনো একটি কিংবদন্তী আছে। ঈশা খাঁ তার সৈন্যদের নিয়ে পথ দিয়ে এগার সিন্দুর দুর্গ থেকে যাচ্ছিলেন তখন মন্দিরে ভোগ রান্না হচ্ছিল। এর গন্ধে ঈশা খাঁ গতিরোধ করেন। সেই থেকে এই অঞ্চলের নাম ভোগ বেতাল। ঈশা খাঁ এই মন্দির সংস্কার করেছেন এবং বহু জায়গায় দান করেছেন তামার পাত্রে লিখে। একটা জরাজীর্ণ ব্রিজ এই মন্দিরের কাছে পানাম নগরীর নকশায় নির্মিত। এখানে প্রতিবছর রথযাত্রা, বার্ষিক উৎসব, দোল পূর্নিমা,জন্মাষ্টমী, শিব রাত্রী, ঝুলনযাত্রা, বাসন্তি পূজাসহ নিত্য পূজা পার্বণ হয়ে আসছে। গোপীনাথ মন্দিরে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান রথযাত্রা। ১৫৮৫ ইং সালে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় এই মন্দিরে প্রথম শুরু করেন এই রথযাত্রা। কিংবদন্তীতে আছে উড়িষ্যার জগন্নাথ, বঙ্গের গোপীনাথ। প্রাচীন বাংলার সর্ববৃহৎ রথযাত্রা ছিল গোপীনাথের রথযাত্রা। এককালে রথযাত্রা উপলক্ষে বসতো ১৫দিনব্যাপী মেলা। ভাটি এলাকা ও হাওরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসতো নৌকা ও বজরার বহর। জড়ো হতো বাউল সাগর নদীতে। এককালে ১০৫ফুট উচ্চতাসম্পন্ন ৩২ চাকার রথ স্থানীয় জমিদারদের পোষা হাতী দিয়ে গোপীনাথ মন্দির থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশাল সড়ক পথ দিয়ে ভক্তবৃন্দ রথ টেনে নিয়ে যায় গুন্ডিচা বাড়ীতে (শ্বশুর বাড়ী)। আবার ৮ দিন পর ফিরে আসে নিজ বাড়ীতে। রথ ছিল ৩টি, একটি পিতলের, অন্য দুইটি কাঠের তৈরী। আজও বাংলাদেশের মধ্যে ইহাই একমাত্র দূরপাল্লার রথযাত্রা। ১৫৯৫ সালে এগারসিন্দুর দূর্গে ঈশা খাঁ সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ কর্তৃক অবরুদ্ধ হন। মল্লযুদ্ধে সেনাপতি মানসিংহ ঈশা খাঁ কর্তৃক পরাজয় বরণ করেন। বিজয়ী সৈন্যরা বিজয় উল্লাস করেন রথ মেলায় সুপ্রশস্ত রাস্তায়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ২৫ একর ৮ শতাংশ ভূমি রয়েছে। ১৩৪২ বাংলা সনে রথটি ঝড়ে পতিত হলে এর সংস্কার করা হয়। ৩২ চাকার রথটি কালক্রমে ২৪ ও ১৬ চাকায় বর্তমানে ৯ চাকায় রথটি তৈরী হয়। বর্তমানে রথ অতীত কারুকার্যের কিছু স্মৃতি বহন করছে। অদ্যবধি প্রতি বছরই রথযাত্রা ও মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, উক্ত মেলায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখির হাট বসে, যা বাংলাদেশের আর কোথাও নেই। ট্রাস্ট কমিটির সম্পাদক দিলীপ কুমার সাহা জানান, রথ মেরামতের ও সংস্কারের কাজ পুরোদমে চলছে। রথযাত্রা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লক্ষাধিক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটবে।
লাইক:
0
দেখা হয়েছে: ০ বার