পঞ্চগড়-১ আসনের সাংসদের ভাই ও ভাতিজারা সন্ত্রাসী কায়দায় পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের খুনিয়াগছ এলাকার কয়েক কোটি টাকা মুল্যের পাথর সমৃদ্ধ প্রায় সাড়ে চার একর জমি জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছে। ওই জমিতে থাকা বিভিন্ন ফসল ধ্বংস করাসহ বাঁশবাগান, বিভিন্ন গাছপালা কেটে পাথর উত্তোলনের জন্য বর্তমানে মাটি খনন কাজ শুরু করেছে। এ বিষয়ে আদালতে মামলা হলেও সাংসদের দাপটের কারণে পুলিশ রহস্যজনক ভূমিকা পালন করছে। অবশ্য পঞ্চগড়-১ আসনের সাংসদের ছোট ভাই মো. জহিরুল হক প্রধান পাল্টা এক সংবাদ সম্মেলনে তাদের বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দখলকৃত জমির প্রকৃত মালিক দাবিদার ওই গ্রামের মো. হারুন-অর-রশিদ গত রোববার সন্ধ্যায় পঞ্চগড় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলেন, পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজাহারুল হক প্রধানের প্রত্যক্ষ মদদে তার ছোট ভাই জহিরুল হক প্রধানের নেতৃত্বে দুই শতাধিক ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী লাঠিসোঠা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি তাদের মুল্যবান পাথর সমৃদ্ধ ৪.৪৫ একর জমি জোরপূর্বক দখল করে নেয়। এসময় তারা জমিতে থাকা আড়াই হাজার ইউক্যালিপ্টাস গাছ কেটে ফেলে। এছাড়াও হলুদ,পেঁয়াজসহ বিভিন্ন আবাদি ফসল নষ্ট করে দেয়। সন্ত্রাসীরা শত শত মানুষের সামনে ১০টি রাজহাঁস জবাই করে রান্না করে ভূরিভোজ করেছে। তারা সেখানে আতঙ্ক সৃষ্টি করে মহা সমারোহে পাথর উত্তোলনের জন্য মাটি খনন করছে। বাপ দাদার আমল থেকে ভোগ দখলে থাকা ওই জমিতে তারা তান্ডবলীলা চালালেও প্রাণ ভয়ে আমাদের লোকজন সেখানে যেতে পারছে না। জমিতে গেলে আমাদের জানে মেরে ফেলবে এবং মাটির মধ্যে পুঁতে রাখবে বলে হুমকি দিচ্ছে। এ ঘটনার পর হারুন অর রশিদ ২৩ ফেব্রুয়ারি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্থগিতাদেশ চেয়ে একটি আবেদন করে। আদালত আবেদনের বিষয়ে ওই দিনই তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন ও অন্তর্বর্তীকালে শান্তি শৃংখলা রক্ষার ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তেঁতুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের কপি ২৪ ফেব্রুয়ারি থানায় পৌঁছে। কিন্তু পুলিশ গতকাল সোমবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্ণিত বিরোধীয় জমিতে শান্তি শৃংখলা বজায় রাখার জন্য ১৪৪/১৪৫ ধারা কার্যকর করার নোটিশ দিয়েছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে নোটিশ পাওয়ার পরও সাংসদের ভাইয়ের লোকজন জমি খুড়ে পাথর উত্তোলনের কাজ অব্যাহত রেখেছে। দখলদাররা আদালতের আদেশের তোয়াক্কা না করে পুলিশের উপস্থিতিতেই জেলার বাইরে থেকে কয়েকশ’ শ্রমিক এনে সেখানে কাজ করেই চলছে। দখলদাররা ভীতিকর পরিবেশ তৈরির জন্য নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। দখলদারদের নানান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে জমির মালিকরা পরিবার পরিজন নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছেন।
এখনও সাংসদ মোঃ মজাহারুল হক প্রধানের ভাই জহিরুল প্রধানের নেতৃত্বে সেখানে কয়েকশ শ্রমিক পাথর উত্তোলনের জন্য মাটি খননের কাজ করছে। শ্রমিকদের দাবী জমির মালিক এমপির ভাই ফজলার রহমান। এমপির ভাইয়ের নির্দেশে তারা কাজ করছেন। এদের অধিকাংশ শ্রমিক জেলার বাইরে থেকে আনা হয়েছে। জমি দখলে নেয়ার কৌশল হিসেবে টিনের চালা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে দেশীয় অস্ত্র মজুদ করে রাখা হয়েছে। ওই ঘরেই শ্রমিক পরিচয়ে দখলদার বাহিনীর সদস্যরা রাত্রি যাপন করে। সেখানে চলছে রান্নারও কাজ।
এলাকার গৃহিনী মোর্শেদা ও রফিকউদ্দিনসহ অনেকেই জানান, হারুনরা এই জমি ২০ বছর ধরে চাষাবাদ করে আসছে। তারা সেখানে বিভিন্ন প্রকার কাঠ এবং ফলের গাছ লাগিয়েছেন। অধিকাংশ গাছ বড় হয়েছিল। লাখ লাখ টাকার বাঁশ তারা কেটে নিয়ে গেছে। গায়ের জোরে এসব গাছ এবং বাঁশ কেটে তারা লাঠিসোটা বানিয়েছে। অন্যের জমিতে জোরপূর্বক নির্বিচারে পাথর উত্তোলনে এলাকার লোকজনের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করাসহ বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
এদিকে, গতকাল সোমবার বিকেলে ভজনপুর এলাকায় এ ব্যপারে পঞ্চগড়-১ আসনের সাংসদ মো. মজাহারুল হক প্রধানের ভাই মো. জহিরুল হক প্রধান তাৎক্ষণিক এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলেন, এই জমির প্রকৃত মালিক আমার ভাই জয়নাল আবেদীন প্রধান। তিনি বেঁচে থাকতে তারা ফসলের ভাগ দিত। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ফসলের ভাগ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। ভাইয়ের অংশীদার ছেলেদের দখলে ছিল এই জমি। কোন সন্ত্রাসী কায়দায় জমি দখল করা হয়নি। কোন ভাড়াটিয়াও আনা হয়নি। আমাদের জমিতে শ্রমিক লাগিয়ে পাথর তোলা উদ্যোগ নিয়েছি। অন্যের জমি দখল, বাঁশ ও গাছপালা কাটার অভিযোগ সত্য নয়। আদালতের নোটিশ থানার মাধ্যমে গতকাল সোমবার পেয়েছি। আমরা নির্ধারিত তারিখে আমাদের স্বপক্ষের জমির কাগজপত্র নিয়ে আদালতে হাজির হব। এ জমি নিয়ে সাংসদের সঙ্গে কোন সর্ম্পক নেই। তাঁকে জড়িয়ে সংবাদ সম্মেলন করায় তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
পঞ্চগড়-১ আসনের সাংসদ মো. মজাহারুল হক প্রধান মুঠো ফোনে বলেন, ওই জমি আমার ভাইয়ের। ওই ভাই বেঁচে থাকতে তারা ফসলের ভাগ দিত। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ফসলের ভাগ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এখন শুনতেছি ওদের নামে নাকি কাগজ আছে। আমার ভাই জহিরুল হক প্রধানের সঙ্গে আমার কোন সর্ম্পক নেই। এ ব্যাপারে আমি কোনভাবেই জড়িত নই। এ নিয়ে আইন আদালত রয়েছে।
লাইক:
1
দেখা হয়েছে: ০ বার