-
by Md. Shajalal
-
panchagarh
-
Dec 18 2010
-
10:42
-
সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়। চা চাষ পঞ্চগড়ের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সম্ভাবনার স্বর্ণদ্বার উন্মোচন করেছে। পঞ্চগড় বর্তমানে দেশের তৃতীয় চা অঞ্চল এলাকা। ১০ বছর আগের পঞ্চগড় আর বর্তমানের চায়ের নতুন আবাদভুমি পঞ্চগড় এখন অনেক পার্থক্য। এই ১০ বছরে পুরো বদলে গেছে পঞ্চগড় জেলার পরিবেশ। এককালের বিরানভুমি পঞ্চগড় এখন চায়ের সবুজ আভায় আলোকিত হয়ে উঠেছে। দেশের সর্বত্তোরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার বিশাল এলাকা জুড়ে এবং পঞ্চগড় ও আটোয়ারীর কিছু এলাকায় বিভিন্ন চা এস্টেট ও বাগানগুলোতে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে চা বাগান গড়ে উঠেছে এবং চায়ের সবুজ পাতা দিয়ে পুরো অঞ্চলও ভরে গেছে। পঞ্চগড় থেকে বছরে প্রায় ৩ কোটি কেজি চা আহরণ করা সম্ভব। এ জেলার উৎপাদিত চা স্বাদে, গুণে ও মানে আন-জার্তিক মানের দার্জিলিং ভ্যারাইটির মতই। ফলে পঞ্চগড়ের উৎপাদিত চা চট্রগ্রামের অকশন মার্কেটে ভাল দাম পাচেছ। এখানকার উৎপাদিত উন্নতমানের চা রপ্তানি করে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জিত হচেছ। যা পঞ্চগড়সহ দেশের অর্থনীতিতে গুর"ত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি স'ানীয় অসংখ্য বেকার নারী-পুর"ষের কর্মসংস'ানের পথ সৃষ্টি হয়েছে।
ক্ষুদ্র চা চাষীরা চা পাতার ন্যায্য মূল্য, সহজ শর্তে ঋণ এবং সার-কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ না পাওয়া এবং সরকার ও চা বোর্ড ক্ষুদ্র চা চাষীদের স্বার্থ সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় চা চাষ বাড়ছে না।
চা পাতার মূল্য বৃদ্ধি না করায় কৃষক ও চা বাগান মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস' হ"েছ। এছাড়া দুরবর্তি নানা স'ানে অবসি'ত চা বাগান থেকে কাচাঁ পাতা পরিবহন করে নিয়ে গিয়ে ওই কারখানায় বিক্রি করে উৎপাদন খরচটুকু তুলতে না পারায় তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। এ অবস'ায় নতুন করে চা চাষে স'ানীয় কৃষকরা অনীহা প্রকাশ করছে। এসব কারণে চায়ের আবাদ যে হারে বাড়ার কথা ছিল সে হারে বাড়েনি।
দীর্ঘদিন থেকে এ জেলার বিভিন্ন সংবাদপত্রের কর্মীরা পঞ্চগড় জেলায় চা চাষের সম্ভাবনার কথা পত্রিকায় প্রকাশের পর ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ চা বোর্ডের একটি টিম চা চাষের সম্ভাব্যতার বিষয়ে মৃত্তিকা জরীপ করে পঞ্চগড় জেলায় চা চাষের বিপুল সম্ভাবনার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।
২০০০ সালের ২ এপ্রিল “তেঁতুলিয়া টি কোম্পানী লিমিটেড” নামের একটি চা কোম্পানী পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার বুড়াবুড়ি নামক স'ানে আনুষ্ঠানিকভাবে সমতল ভূমিতে চা চাষের ঐতিহাসিক শুভ সুচনা করেন। পরবর্তী বেশ কয়েকটি কোম্পানী চায়ের আবাদ শুর" করেন। সরকার প্রথমদিকে ক্ষুদ্র চা চাষের প্রক্রিয়া শুর" করলেও ক্ষুদ্র চা চাষীদের নানা সমস্যার কারণে সরকারের এ উদ্যোগ সফল হয়নি। কিন' কাজী এন্ড কাজী টি এস্টেটসহ বেশ কয়েকটি বড় বড় চা কোম্পানী প্রচুর পরিমাণে জমি কিনে চায়ের আবাদ করেন। ক্রমান্বয়ে বিরান ভূমি হিসেবে পরিচিত পঞ্চগড় চায়ের সবুজ আভায় আলোকিত হয়ে উঠে। চারদিকে এখন শুধু সবুজের সমারোহ। এ জেলার পতিত ভূমিগুলো ভুপ্রকৃতির এক অপূর্ব সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে।
চা চাষের শুর"র পর পরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা ছুটতে থাকেন পঞ্চগড়। স'ানীয় ব্রোকারদের (দালাল) মাধ্যমে কিনতে থাকেন জমি। শুর" করেন চা চাষের প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে যখন চা শিল্পের দুর্দিন চলছে ঠিক তখনই নতুন আশার আলো জাগিয়েছে পঞ্চগড়।
পঞ্চগড় চা বোর্ডের আঞ্চলিক অফিস সূত্রে জানা গেছে, স্মল গ্রোয়ার্স, স্মল হোল্ডার ও টি এস্টেট এই ৩ পদ্ধতিতে পঞ্চগড়ে চা চাষ হ"েছ। ১৮৩ জন স্মল গ্রোয়ার্স, ১০ জন স্মল হোল্ডার ও ২০টি টি চা চাষ করেছেন। ১ থেকে ৫ একর পর্যন- পর্যায়কে ক্ষুদ্র চাষী, ৫ একর থেকে ২০ একর পর্যন- ক্ষুদ্রায়তন চা চাষ এবং ২০ একরের বেশি পর্যায়কে টি এস্টেট বা টি কোম্পানি বলা হয়। কাজী এন্ড কাজী টি এস্টেট, ডাহুক টি এস্টেট, স্যালিল্যান্ড টি এস্টেট, করতোয়া টি এস্টেট, ময়নাগুড়ি টি এস্টেট, এ জেড এম মেনহাজুল হক, এ জেড এম মাজেদুল হক, এ জেড এম ওয়াজেদুল হক, এ জেড এম রেজওয়ানুল হক, ফাতেমা এবং পিআরপি চা বাগান প্রমুখ চা চাষ করেছে। বৃহৎ আরও কয়েকটি চা কোম্পানি চা চাষের প্রক্রিয়া চালালেও অন্যান্য কোম্পানীগুলো শুধু জমি ক্রয় করে নামে মাত্র সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে চা চাষ বা শিল্প কলকারখানা স'াপনের ভান করে চলেছে। অবশ্য প্রশাসনও এসব অবৈধ ভূমি লোভী মালিকদের বির"দ্ধে আইনানুগ কোন ব্যবস'া নি"েছন না। প্রশাসনের একটি অংশ এসব মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
পঞ্চগড় চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার ৪০ হাজার একর জমি চা চাষের উপযোগি। দীর্ঘ ১০বছরে এ পর্যনত্ম ২হাজার ৩শ’ ২৩ একর জমিতে চা চাষ করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৮লাখ কেজি কাঁচা চা পাতা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। জেলার ৩টি চা প্রক্রিয়াজাতকারখানায় চাষীরা প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতা ১৬টাকা দরে বিক্রি করছেন। তবে তারা প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার মূল্য ২০ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতা ১৬ টাকা দরে বিক্রি করছেন। বর্তমানে চা পাতার যে মূল্য এতে চাষীদের লাভ হয় না বললেই চলে। তবে প্রতি কেজি চা পাতার মূল্য ২০ টাকা করা হলে লাভবান হবেন বলে মনে করছেন ক্ষুদ্র পর্যায়ে চা চাষকারী কৃষকরা।
ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পঞ্চগড়ে চা চাষ শুর" হলেও সে তুলনায় চা চাষের পরিধি বাড়েনি। চা চারার অভাব, চা পাতার ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ-সার-কীটনাশক ও কৃষি উপকরণ না পাওয়াসহ চা বোর্ড ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে চা চাষ বাড়ছে না বলে মনে করছেন চা চাষী ও বিশেষজ্ঞরা।
পঞ্চগড়ে চা চাষের জন্য ইতিমধ্যে বাংলদেশ চা বোর্ড ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তি অনুযায়ী রেজিষ্ট্রেশনকৃত চা চাষী ও চা বাগানকে ঋণ সুবিধা দেয়া হ"েছ।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ক্ষুদ্রায়তন চা চাষ উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে চা চাষে চাষীদের সহায়তা করতে ইউরোপিয়ান কমিশন (ইসি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন বোর্ড (রাকাব) যৌথভাবে ঋণ প্রদান করছে। চা চাষে ঋণ প্রদানের জন্য যৌথভাবে ৬ কোটি ২১লাখ ৫৭ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। কিন' এ পর্যনত্ম মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ ৬১ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। চা চাষ সমপ্রসারণের জন্য হেক্টর প্রতি কৃষককে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা ঋণ প্রদান করা হ"েছ।
তবে ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি জটিল। ঋণ গ্রহণে ই"ছুক চা চাষীকে প্রস-াবিত কর্মসূচিসহ নির্ধারিত ফরমে পরিচালক, পিডিইউ, বিটিবি, শ্রীমঙ্গল বরাবরে আবেদন করতে হয়। অনুমোদনের পর অনুমোদিত কর্মসূচির ভিত্তিতে নির্ধারিত ফরমে রাকাবের কাছে ঋণের জন্য আবেদন করতে হবে।
ব্যাংকের ঋণ পেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ঋণ প্রস-াব, চা বোর্ডের অনুমোতিসহ নানা কাজে হয়রানির কারণে ঋণ বিতরণ সুষ্ঠুভাবে হ"েছ না বলে জানিয়েছেন চাষীরা। কৃষকরা জানায়, ঋণ বিতরণে কৃষকদের হয়রানিসহ ঋণ বিতরণ করার আগেই প্রতিজন কৃষকের কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা করে নেয়া হ"েছ। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের চাহিদাকৃত টাকা না দিলে ঋণ বিতরণে বার বার ঘোরানো হ"েছ। হয়রানি করা হ"েছ সাধারণ কৃষকদের। টাকা না দেয়ার কারনে অনেক কৃষককে ঋণও দেয়া হয়নি এমন নজিরও রয়েছে।
চা বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, চায়ের উৎপাদন প্রতি বছর গড়ে শতকরা ১ভাগ হারে বাড়ছে এবং অভ্যন-রিণ চাহিদা বাড়ছে শতকরা ৩ দশমিক ৫ ভাগ হারে। এ অবস'া চলতে থাকলে আগামী ২০১৫ সালে চা রপ্তানি শূণ্যের কোটায় নেমে আসবে। অভ্যন-রিণ চাহিদা পূরণে দেখা দেবে ঘাটতি। এ অবস'ায় পঞ্চগড়ে চা চাষের উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এ জেলায় চা চাষের পরিধি আরও বাড়ানোর জন্য চা বোর্ড নির্বাচিত চাষীকে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দি"েছ। পাশাপাশি হেক্টর প্রতি ১৪ হাজার টাকা ভতুর্কি প্রদান করছে। ইতিমধ্যে চা চাষীদের মাঝে চা বোর্ড ৬ লাখ ৬ হাজার টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।
তৎকালীন টি বোর্ড চেয়ারম্যান চা চাষীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সরকারিভাবে চা পাতা বিক্রির জন্য কারখানা স'াপনের আশ্বাস দেন। কিন' এখন পর্যন- চা বোর্ড কোন কারখানা স'াপন করেননি। ফলে চাষীরা চা কারখানা কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেয়া দামে চা পাতা বিক্রি করতে বাধ্য হ"েছন। কাজী এন্ড কাজী টি এস্টেট তাদের নিজস্ব বাগানে উৎপাদিত চাপাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে বাজারজাত করছেন। তাদের চা কারখানায় তারা অন্য কোন চাষী বা বাগানের কাঁচা চাপাতা কিনেন না। তাদের উৎপাদিত চাপাতায় মীনা টি নামে চা বাজারে বিক্রি হ"েছ। ক্ষুদ্র চাষী ও ক্ষুদ্র বাগান মালিকরা তাদের চা পাতা করতোয়া টি এস্টেট ও তেঁতুলিয়া টি কোম্পানী লিমিটেডের কাছে বিক্রি করছেন। প্রথমদিকে তেঁতুলিয়া টি কোম্পানী কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণে মনোপলি ব্যবসা করেছে। তারা ই"চামত দাম নির্ধারণ করে কৃষকদের ঠকিয়েছে। পরবর্তীতে জেলার সদর উপজেলার কাজিপাড়ায় করতোয়া টি এস্টেট কারখানায় স'াপন করে কৃষকদের কাছ থেকে চা পাতা ক্রয় শুর" করলে কৃষকদের মাঝে সসি- ফিরে আসে।
উত্তরবঙ্গ চা সংসদের সভাপতি ও ডাহুক টি এস্টেট লিমিটেডের ব্যবস'াপনা পরিচালক আমির"ল ইসলাম খোকন জানান, চা বোর্ডের চেয়ারম্যান এখানে কারখানা স'াপনের ঘোষণা দেন। একারণে ক্ষুদ্র চা চাষীরা চা চাষে আগ্রহ দেখায়। কিন' পরে কর্তৃপক্ষ কারখানা স'াপনের সিদ্ধান- থেকে সরে আসে। নতুন নতুন চা কারখানা স'াপন করা হলে কৃষকরা চা পাতার ন্যায্য মূল্য পাবে। চা পাতার দাম না বাড়ানোর কারণে ক্ষুদ্র চা চাষীরা হতাশ হন। দাম বৃদ্ধির বিষয়ে টি বোর্ড, রাকাব, কারখানা প্রতিনিধি এবং চা চাষীদের নিয়ে বেশ কয়েকটি সভা হয়। এতে প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার মূল্য ২০ টাকা করার সিদ্ধান- হয়। কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ না করায় চাষীরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়েন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসিডি সার্কুলার মোতাবেক ঋণ প্রদানের পরে ৭ থেকে শুর" করে ১৫টি বার্ষিক কিসি-তে পরিশোধ যোগ্য নিয়ম করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গ চা সংসদ ঋণ প্রদানের ৮ বছর পর ১৫টি কিসি-তে ঋণ পরিশোধ এবং কাঁচা চা পাতার মূল্য প্রতি কেজি ২০ টাকা নির্ধারণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ স্মল টি গার্ডেন ওনার্স এসোসিয়েশনের (প্রস-াবিত) সভাপতি ও উত্তরবঙ্গ চা সংসদের আহবায়ক আমির"ল হক খোকন চা চাষীদের নানা সমস্যার কথা উল্ল্লেখ করে বলেন, টি বোর্ড, রাকাব, কারখানা প্রতিনিধি ও চাষীদের নিয়ে বেশ কয়েকটি সভা হয়। এতে প্রতিকেজি কাঁচা চা পাতার দাম কমপক্ষে ২০ টাকা করার কথা চাষীরা জানিয়েছিলেন। কিন' কারখানা কর্তৃপক্ষ এখন পর্যনত্ম প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার মূল্য ২০ টাকা করেননি।
ক্ষুদ্র চাষী মতিয়ার রহমান, ইসাহাক আলী, আব্দুল জব্বার, প্রভাস রায় জানান, টি বোর্ডের কর্মকর্তারা যে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে চা চাষে উদ্বুদ্ধ করেছিল সে অনুযায়ী চা চাষীদের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেনি। অকশন মার্কেটে চা’র দাম বাড়লেও স'ানীয় চা চাষীদের চা পাতার দাম বাড়ানো হ"েছ না।
তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর এলাকার চা চাষী আব্দুল জব্বার জানান, কাঁচা চা পাতার মূল্য বৃদ্ধি না হওয়ায় ক্ষুদ্র চা চাষীরা চা আবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এ কারণেই ক্ষুদ্র চা চাষী পর্যায়ে চায়ের আবাদ বাড়ছে না বলেও তিনি মন-ব্য করেন।
তেঁতুলিয়ার মাঝিপাড়া এলাকার ক্ষুদ্র চা চাষী আব্দুর রহমান ও ইছাহাক আলী মন্ডল জানান, চা চাষে সার-কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় কৃষি সরঞ্জামাদি পা"িছ না। সিলেট অঞ্চলে যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে আমাদের এখানে এসব সুযোগ সুবিধা সহজলভ্য হলে ক্ষুদ্র পর্যায়ে চায়ের আবাদ দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেত বলে তারা মনে করেন।
আটোয়ারীর সোনাপাতিলা গ্রামেরক্ষুদ্র চা চাষী মতিয়ার রহমান জানান, চা বাগান মালিকরা প্রয়োজনীয় সার, কীটনাষকসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ ঠিকভাবে পা"েছ না। ফলে চা চাষে কোন কোন সময় ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যা"েছ।
সদর উপজেলার দ্বারিকামারী এলাকার ক্ষুদ্র চা চাষী মোজাহেদুল হাসান জানান, ২০ বিঘা জমিতে চায়ের আবাদ করেছি। ইতোমধ্যে ৭ বিঘা জমিতে চা চাষ হয়েছে। যা থেকে প্রতি সপ্তাহে ৫০/৬০ কেজি কাঁচা চা পাতা তুলছি। টিটিসিএল বর্তমানে যে মূল্যে চা পাতা ক্রয় করছে তা দিয়ে উৎপাদন খরচ উঠছে না। তিনি প্রতি কেজি চা পাতার মূল্য ২০ টাকা করার দাবি করেছেন।
জেলার বিভিন্ন চা বাগানগুলোতে অসংখ্য নারী ও পুর"ষ শ্রমিক কাজ করছে। এসব শ্রমিকরা ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হ"েছ। বর্তমানে চা বাগানগুলোতে সহ্রাধিক শ্রমিক কাজ করছে। চা বাগান মালিকরা চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরী দেয় মাত্র ৬০/৭০ টাকা। এখানে প্রচলিত শ্রম আইন মানা হ"েছ না। শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের জন্য কোন অতিরিক্ত ভাতা দেওয়া হ"েছ না। দেওয়া হ"েছ না কোন প্রকার ছুটি। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের কোন নিয়োগ পত্র, হাজিরা খাতা, ও বেতন রেজিষ্টার খোলা হ"েছ না। শ্রমিকদের ৮ ঘন্টা কাজের অধিকার নিশ্চিত হয়নি, নুন্যতম মজুরী নেই, নিরাপদ কর্ম পরিবেশও সৃষ্টি হয়নি। শ্রমিকরা সহকারী শ্রম পরিদর্শকদের অফিস পঞ্চগড়ে স'াপনের দাবি জানিয়েছে। শ্রমিকদের কল্যাণে শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র চালুর দাবিও করেছে। যেখানে ডাক্তার ক্লিনিক, বিত্তবিনোদনের জন্য ও খেলাধুলা, বইপত্র ইত্যাদি থাকবে। অবশ্য রাজশাহী রেজিষ্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়নসের সার্ভে অফিসার আব্দুস সালাম সমপ্রতি পঞ্চগড়ে এসে চা বাগান গুলি পরিদর্শন করেন। এসময় তার কাছে শ্রমিকরা তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরেন।
এদিকে পঞ্চগড় শহরের সন্নিকটে বাগানবাড়ী নামক স'ানে ৪.৭০ একর জমি অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশ চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয় স'াপন করা হয়েছে। এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস'ার উন্নয়ন তথা দারিদ্র দূরীকরণের উদ্দেশ্যে ইসি কমপ্লেক্স তহবিলের আর্থিক সাহয়তায় ‘‘বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ক্ষুদ্রায়তন চা চাষ উন্নয়ন’’ র্শীষক একটি প্রকল্প বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়। এ প্রকল্পের আওতায় আবাসন সুবিধা, নিউক্লিয়াস প্লট ও প্রদর্শনী প্লট প্রদর্শনী প্লট স'াপন করা হয়েছে।
চা বোর্ড পঞ্চগড়ের আঞ্চলিক অফিসের উন্নয়ন কর্মকর্তা মোঃ আমির হোসেন জানান, পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ড নির্বাচিত চাষীদেরকে চা চাষের সম্যক ধারণা দিতে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দি"েছ। স'ানীয়ভাবে এই শিল্পকে ফলপ্রসু করতে উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে চারা রোপণ বাগান পরিচর্যা, চা পাতা সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং চা চাষের ওপর প্রশিক্ষণ ও কারিগরী সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। চা বোর্ড চাষীদেরকে চা চাষের জন্য উন্নত জাতের চায়ের চারার মূল্য বাবদ হেক্টর প্রতি ১৪ হাজার টাকা ভর্তুকি প্রদান করছে। এছাড়া সার, কীটনাশক, স্পেয়ারসহ অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি সহজলভ্যের জন্য ব্যবস'া নেবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন।
পঞ্চগড় চা বোর্ডের নাম প্রকাশে অনি"ছুক একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, কৃষকদের দাবি অনুযায়ী চা পাতার মুল্য প্রতি কেজি ২০ টাকা নির্ধারণ করাসহ ঋণ পাওয়ার বিষয়টি আরও সহজিকরণের প্রয়োজন। এতে চা চাষের পরিধি বৃদ্ধি পাবে।
করতোয়া চা কারখানার প্রকল্প পরিচালক এএসএম শাহ আলম ভূইয়া জানান, সদর উপজেলার কাজীপাড়া এলাকায় অত্যাধুনিক করতোয়া চা কারখানায় ঘন্টায় ১২০০ কেজি কাঁচা চা পাতা প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব। আমরা চা চাষীদের সাধ্যমত সহায়তা দিয়ে যা"িছ।
টিটিসিএল কর্তৃপক্ষ জানায়, কারখানায় চা উৎপাদন করতে ২২০ ভোল্ট বিদ্যুতের প্রয়োজন। সেখানে আমরা পা"িছ ১৬০ থেকে ১৭০ ভোল্ট। বাধ্য হয়ে আমরা জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন করি। ফলে এ খাতে আনুপাতিক হারে বেশি খরচ হচেছ। তারা জানান, দু’বছর আগে আমরা কারখানার জন্য বিদ্যুতের ২২০ ভোল্টের এলটি লাইন দেয়ার জন্যে আবেদন করেছিলাম। কিন' এখনও পাইনি। কবে পাব জানি না। অন্যদিকে সিলেট ও চট্টগ্রামে গ্যাস ব্যবহার করার কারণে প্রতি কেজি চা প্রক্রিয়াজাকরণে জ্বালানি খরচ হয় প্রায় ৩ টাকা। আর টিটিসিএল কারখানায় কেজি প্রতি চা উৎপাদনে খরচ হয় ৩৮ টাকা।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) আঞ্চলিক ব্যবস'াপক খোরশেদ আলম জানান, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির কারণে চা পাতার মূল্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সে কারণে চা শিল্পকে বিশেষ ব্যবস'াপনায় কৃষি পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের প্রস-াব দেয়া হয়েছে। চা কৃষি পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলে সহজে কৃষকরা ভর্তুকিতে সার, কীটনাশকসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধাগুলো পাবে।
করতোয়া চা কারখানার চেয়ারম্যান সৈয়দ কামালউদ্দীন সরকার বলেন, চা চাষীদের কাছ থেকে নায্যমূল্যে কাঁচা চা পাতা ক্রয় করা হবে। আমরা সব সময় চাষীদের দিকটা বিবেচনায় রাখব। আমরা ১৬ টাকা দরে প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতা ক্রয় করছি। কৃষকদের পাতা নেওয়ার পরই পাতার দাম পেয়ে যা"েছ।
প্রতিবছর দেশের অভ্যন-রীণ চায়ের চাহিদা ৩ দশমিক ৫ ভাগ হারে বাড়ছে। কিন' চা উৎপাদন তার অর্ধেকেও বাড়ছেনা। এ অবস'া চলতে থাকলে ২০১৫ সালে চা রপ্তানি শুণ্যের কোঠায় নেমে আসবে।
চা চাষে জটিলতা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, সার-কীটনাশক, উন্নত জাতের চা চারাসহ কৃষি উপকরণ সরবরাহ, উৎপাদিত কাঁচা চা পাতার ন্যায্য মূল্য ও সময়মত ভর্তুকির টাকা প্রদান, চাষীদের নিবিড়ভাবে উদ্ধুদ্ধকরণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস'া গ্রহণ করা হলে পঞ্চগড়সহ দেশে চায়ের উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন চা বিশেষজ্ঞরা। #
মোঃ শাহ্জালাল
পঞ্চগড় প্রতিনিধি
পঞ্চগড়।
তারিখঃ ১২.১২.২০১০ইং
মোবাইল-০১৭২৫৩০৩০০৪
Credibility:
2
Views: 0 times